শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মিলনকে ঘিরে রাজনৈতিক অর্থায়নের অভিযোগ, ‘সুইট কর্নার’-এ খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
নারায়ণগঞ্জের সৈয়দপুর এলাকায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন মোহাম্মদ মিলন হোসেন। স্থানীয়ভাবে তিনি সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছেন কয়েকজন এলাকাবাসী। আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তার প্রভাব, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আর্থিক সহযোগিতার কথিত ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
এবার তার নাম ঘিরে রাজনৈতিক অর্থায়ন, গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির কথিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘সুইট কর্নার’-এর অনুমোদন ও খাদ্যমান নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে মোহাম্মদ মিলন হোসেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলটির বিভিন্ন নেতাকর্মী এবং সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতেন। এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সংশ্লিষ্ট কিছু নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডে অর্থের যোগানদাতা হিসেবেও তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সংগঠন আওয়ামী লীগ বর্তমানে দেশে গার্মেন্ট শিল্পে শ্রমিকদের অস্থিরতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশকে অস্থির করে তুলছে এর পিছনে অর্থ যোগান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ মিলন হোসেনের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক পটভূমিতে শামীম ওসমান, মিলন শ্যামলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি নাম। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তার রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে মোহাম্মদ মিলন হোসেনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার ওঠাবসা এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী, অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৬ সালে আইনগতভাবেও এ নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি বহাল রাখা হয়েছে।
এদিকে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি বিচারাধীন; অভিযোগ গঠনকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে পরিচিত হিসেবে আলোচিত মোহাম্মদ মিলন হোসেনের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল? দলীয় কর্মসূচি, সহযোগী সংগঠনের কর্মকাণ্ড কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে তার কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা কি কখনো তদন্ত করা হয়েছে?
অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগ
মোহাম্মদ মিলন হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মী এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কিছু কর্মকাণ্ডে তিনি আর্থিক সহযোগিতা করতেন।
স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগকারীর দাবি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সঙ্গে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে তার অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছিল। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংগঠনিক তৎপরতায় অর্থের যোগান দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন তারা।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি, শ্রমিক অসন্তোষ কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরির পেছনে অর্থায়নের অভিযোগও রয়েছে।
‘সুইট কর্নার’ ঘিরে খাদ্য নিরাপত্তার গুরুতর প্রশ্ন
রাজনৈতিক অভিযোগের পাশাপাশি মোহাম্মদ মিলন হোসেনের মালিকানাধীন বলে পরিচিত ‘সুইট কর্নার’ বেকারি ও মিষ্টির দোকান ঘিরেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুইট কর্নারে নেই বিএসটিআই অনুমোদন।
স্থানীয় ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে কেক, বিস্কুট, দই, মিষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে। কিন্তু এসব পণ্য তৈরির পরিবেশ, ব্যবহৃত কাঁচামালের মান এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
একাধিক অভিযোগকারীর দাবি, নিম্নমানের ও পচা গম ব্যবহার করে ময়দা প্রস্তুত করা হয় এবং সেই ময়দা দিয়ে বিস্কুট, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা হচ্ছে।
তাদের আরও অভিযোগ, কম দামে পণ্য বিক্রির আকর্ষণীয় অফার দিয়ে ক্রেতাদের কাছে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু কম দামের আড়ালে খাদ্যপণ্যের প্রকৃত মান কতটা বজায় রাখা হচ্ছে, সেটি যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, এসব পণ্য খাওয়ার পর শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে চিকিৎসকের প্রতিবেদন, খাদ্য পরীক্ষার ফলাফল কিংবা অসুস্থতার সঙ্গে পণ্যগুলোর সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করে এমন নথি এখনো পাওয়া যায়নি।
খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব পণ্যের বড় একটি অংশ শিশুদের খাদ্যতালিকায় থাকে।
বিএসটিআই অনুমোদন নেই? পরিবেশ ছাড়পত্র ও কারখানার লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন
সুইট কর্নারের ব্যবসায়িক অনুমোদন নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় বিএসটিআই সনদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, কারখানার প্রযোজ্য লাইসেন্স এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিশেষ করে যেসব খাদ্যপণ্যের জন্য বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মানসনদ প্রয়োজন, সেগুলো যথাযথ অনুমোদন ছাড়া উৎপাদন বা বাজারজাত করা হচ্ছে।
কম দামের খাদ্যপণ্য, বেশি ঝুঁকির আশঙ্কা?
স্থানীয় ক্রেতাদের অভিযোগ, সুইট কর্নারের কিছু পণ্য বাজারের প্রচলিত দামের তুলনায় কম দামে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। কম দামে পণ্য পাওয়ার কারণে অনেক ক্রেতা আকৃষ্ট হলেও পণ্যের কাঁচামাল ও উৎপাদন পরিবেশ সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
একজন স্থানীয় ভোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দাম দিয়ে খাবার কিনে বাচ্চাদের খাওয়াতে হয়। কিন্তু খাবারগুলো কোথায় এবং কী পরিবেশে তৈরি হচ্ছে, সেটা যদি নিশ্চিত না হওয়া যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ভয় কাজ করে। প্রশাসনের উচিত একবার প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষা করা।”
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত তদারকি করছে কি না।
প্রশাসনের জরুরি তদন্ত ও অভিযান দাবি
মিলন হোসেন শ্যামলকে ঘিরে ওঠা রাজনৈতিক অর্থায়নের অভিযোগ এবং সুইট কর্নারের খাদ্য নিরাপত্তা ও অনুমোদনসংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবি, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।



