উখিয়ায় গ্যাসের সঙ্গে তেল থাকার সম্ভাবনা দেখছে পেট্রোবাংলা
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫ এএম
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ বসানোর সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নির্গত হওয়ার স্থানে জ্বালানি তেল বা অন্য কোনো হাইড্রোকার্বন উপজাত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স কর্মকর্তারা।
গতকাল শুক্রবার রাতে ছোট ইনানীতে মোস্তফা সিকদারের বাড়ির উঠানে নলকূপ বসানোর স্থানে গ্যাস থেকে জ্বলতে থাকা শিখা পর্যবেক্ষণ করে তারা এমন প্রাথমিক ধারণার কথা জানিয়েছেন।
গত ২৭ অক্টোবর সকালে ওই স্থানে নলকূপ বসানোর জন্য খননকাজ করার সময় গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মোহাম্মদ শোয়েব সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে ২৯ অক্টোবর পেট্রোবাংলায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের বরাতে বৈঠকে তারা তাদের প্রাথমিক ধারণা উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, গ্যাসটি বায়োজেনিক উৎসের নয়, বরং থার্মোজেনিক প্রকৃতির হতে পারে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পেট্রোবাংলা পরিচালক শোয়েব বলেন, 'প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে এখানে অগভীর গ্যাসের আধার রয়েছে, যেখানে থেকে আগুনের উৎপত্তি।'
বাংলাদেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাস পাওয়া যায়। তবে এখান থেকে নির্গত গ্যাসের উৎস, প্রকৃত পরিমাণ বা উৎসে কোনো লিক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।
এ সময়ের মধ্যে কর্মকর্তারা আগুনের শিখার উচ্চতা এবং গ্যাস নির্গমনের ধরন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
শোয়েব বলেন, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পর যদি আগুনের শিখার উচ্চতা বাড়ে বা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে গ্যাসের প্রবাহ থামাতে তাঁরা প্রাথমিকভাবে একটি 'রিলিফ ওয়েল' (সহায়ক কূপ) খননের কথা বিবেচনা করবেন।
এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় বলে জানান তিনি।
তবে পর্যবেক্ষণকালে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই কর্মকর্তারা আরও জানান, আশপাশের এলাকার বেশ কিছু এলাকায়ও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূতাত্ত্বিক গঠনের পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের গ্যাস নির্গমন ঘটে থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট শুটর জানায়, ওই এলাকায় গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে পরবর্তীতে থ্রিডি জরিপ চালাবে বাপেক্স। জরিপের তথ্যে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মজুদের ইঙ্গিত মিললে নতুন কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুক্তাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বাপেক্সের আছে এবং নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করেই তারা তা পারবেন।
তবে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বিবেচনা করে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, একটি বাড়ির উঠানে ৫ দিন ধরে গ্যাস জ্বলতে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।
ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাসের খনির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাপেক্সের একটি কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেয়।
তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক হয়।
বৈঠকে আগুনের উৎসের চারপাশের এলাকাকে বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পরবর্তীতে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তারের সই করা এক আদেশে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ জনগণের প্রবেশ ও উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
আদেশ অনুযায়ী, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় আগুন জ্বালানো, ধূমপান করা, দেশলাই বা লাইটার ব্যবহার করা এবং স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এসব নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মাইকিং করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া ও লাল নিশান টাঙানো হয়েছে।
এত সব ব্যবস্থার পরও দুর্ঘটনাস্থলের কাছে উৎসুক জনতা জটলা করা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। টানা চার দিন ধরে গ্যাস জ্বলতে থাকায় ইনানীর ছোট খাল এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।



