স্বপ্ন পূরণে পায়ে হেঁটে মক্কার পথে ৬০ বছরের আব্দুর রহিম
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২২ পিএম
বয়স ৬০ বছর। সম্বল বলতে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি জীর্ণ কুঁড়েঘর। জীবিকার তাগিদে অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করেন। অভাবের সংসারে স্ত্রীও স্থানীয় একটি হোটেলে মসলা বাটার কাজ করেন। অথচ এমন সীমাহীন অভাবের মধ্যেও তাঁর হৃদয়ে লালিত হয়েছে এক স্বপ্ন—পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালন করা। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল করে পায়ে হেঁটেই মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন ৬০ বছর বয়সী আব্দুর রহিম।
তিনি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের আমিনপুর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মৃত ফয়েজ উদ্দিন। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেন তিনি।
শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে আব্দুর রহিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘর বলতে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর। টিনের ছাউনির ওপর বৃষ্টির পানি ঠেকাতে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এই জরাজীর্ণ ঘরেই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি।
আব্দুর রহিমের স্ত্রী রহিতন বিবি জানান, তাঁর স্বামী পেশায় একজন কৃষিশ্রমিক। অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। সংসারের অভাব-অনটন সামাল দিতে তিনিও স্থানীয় একটি হোটেলে মসলা বাটার কাজ করেন। তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
স্বামীর হজ পালনের স্বপ্ন সম্পর্কে রহিতন বিবি বলেন, প্রায় ছয় বছর আগে তাঁর স্বামী বরিশালের চরমোনাইয়ে ওরশ মাহফিলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর থেকেই তাঁর মনে হজ পালনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই হজে যাওয়ার ইচ্ছার কথা বলতেন। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সেই স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না।
তিনি আরও বলেন, স্বামীর স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি কখনো বাধা দেননি। শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে রওনা হওয়ার পর থেকে তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন, যেন আল্লাহ তাঁর স্বামীর মনের আশা পূরণ করেন। তবে স্বামীর কাছে কত টাকা রয়েছে, তা-ও তিনি জানেন না। এ নিয়ে তাঁর মনে দুশ্চিন্তাও রয়েছে।
একই গ্রামের আনোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, শফিকুল ইসলাম ও সুলতান মাহমুদসহ অন্তত ১০ জন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে আব্দুর রহিমের মধ্যে হজ পালনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা দেখা গেছে। কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে তিনি হজে যাওয়ার কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতেন। এমনকি অর্থ জমানোর জন্য কর্তন করা গাছের গোড়া ও মোথা সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে লাকড়ি তৈরি করে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করতেন। এভাবে দীর্ঘদিনে তাঁর সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জমেছে বলে জানান প্রতিবেশীরা।
প্রতিবেশীরা আরও জানান, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে প্রায় দুই বছর আগে আব্দুর রহিম পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে ভিসা সংগ্রহ করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে সঙ্গী করে পায়ে হেঁটেই মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন তিনি।
যাত্রার সময় তাঁর গলায় ঝোলানো ছিল পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ পালনে যাওয়ার কথা লেখা একটি নেমপ্লেট। হাতে ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সামান্য অর্থ, সীমাহীন স্বপ্ন আর মহান আল্লাহর ওপর ভরসা নিয়েই শুরু করেছেন তাঁর এই দীর্ঘ ও দুঃসাহসিক পথচলা।
আব্দুর রহিমের এমন যাত্রায় একদিকে যেমন বিস্মিত গ্রামবাসী, অন্যদিকে তাঁর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। তাঁদের প্রত্যাশা, পথে কোনো সহৃদয় ও সামর্থ্যবান মানুষের নজরে পড়বেন আব্দুর রহিম। কেউ তাঁর পাশে দাঁড়ালে হয়তো বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।
এ বিষয়ে ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন বলেন, আব্দুর রহিম তাঁর কাছ থেকে একটি নাগরিকত্ব সনদ নিয়েছেন। তিনি শুনেছেন, আব্দুর রহিম পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।



