লালমনিরহাটে সবজিতে স্বস্তি, চাল-আমিষে নাভিশ্বাস
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৩ এএম
শীতের আগমনী বার্তায় লালমনিরহাটের কাঁচাবাজারে উঠতে শুরু করেছে আগাম জাতের কিছু সবজি। এতে সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিললেও চাল, ডাল, তেল, মাছ ও মাংসের দাম বাড়তি রয়েছে। গতকাল শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে জেলার কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
বাজারের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন জাতের সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্থিরতা চলছে। গত মাসের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম আরও বেড়েছে। চিকন চালের কেজি ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে এখন হয়েছে ৬৪ টাকা, চিকন মসুর ডাল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪২ টাকা এবং সয়াবিন তেলের লিটার ১৯৯ টাকা থেকে বেড়ে ২০৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, ডিমের দাম ডজনে ৬ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। গত তিন মাসে চাল, তেল, ডিম ও মসুর ডালের দাম ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মাছ ও মাংসের বাজারেও রয়েছে দামের ওঠানামা। ছোট মাছের দাম স্থিতিশীল থাকলেও নাইলোটিকা, রুই, গ্রাসকার্প ও পাঙাশের মতো বড় মাছের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি ও দেশি মুরগির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। তবে, গরুর মাংস আগের মতোই কেজিপ্রতি ৭০০ থেকে ৭৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লালমনিরহাটের কাঁচাবাজারে আগাম সবজিতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও চাল, ডাল, তেল, মাছ ও মাংসের দাম ঊর্ধ্বমুখী। গত তিন মাসে নিত্যপণ্যের দাম ৫ থেকে ৮ টাকা এবং বড় মাছ ও মুরগির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং পুষ্টি চাহিদা ও জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে
সবজির বাজারে তুলনামূলক স্বস্তি মিলছে। আলু ও বেগুন কেজিপ্রতি ২০ টাকা, পেঁয়াজ ৪৫ টাকা এবং করলা ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে প্রতি পিস লাউ ১৫ থেকে ২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে, বাজারে আসা নতুন শীতের সবজির মধ্যে কপি কেজিপ্রতি ৮০ টাকা এবং নতুন সিম ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচাবাজারসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষ। তাদের আয় সীমিত ও নির্দিষ্ট। চাল, ডাল, তেল, মাছ, ডিম ও শাকসবজির দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি আয়। ফলে সংসারের খরচ মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে খাবারের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য কমাতে হচ্ছে। কেউ মাছ-মাংস কেনা বাদ দিয়েছেন, আবার কেউ ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। এই বাড়তি দামের চাপ শুধু পকেটেই নয়, বরং পরিবারের পুষ্টি চাহিদা, সন্তানদের পড়ালেখা ও সার্বিক জীবনযাত্রার মানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আদিতমারী কাঁচাবাজারের ক্রেতা অটোচালক চান মিয়া বলেন, ‘সারাদিন অটো চালিয়ে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করি। সেখান থেকে প্রতিদিনের বাজার করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও চিকিৎসার খরচ জোগানো অনেক কষ্টকর। সবজি ও চাল কিনেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে, মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্য হচ্ছে না।’
সারাদিন অটো চালিয়ে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করি। সেখান থেকে প্রতিদিনের বাজার করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও চিকিৎসার খরচ জোগানো অনেক কষ্টকর। সবজি ও চাল কিনেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে, মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্য হচ্ছে না।
অটোচালক চান মিয়া
একই বাজারের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তাদের পরিবহন খরচ বেড়েছে। উৎপাদন ও আমদানি কম থাকলে বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। নতুন সবজির চাহিদা বেশি থাকায় সেগুলোও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। তারা প্রতি কেজিতে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা লাভে পণ্য বিক্রি করেন।
ক্রেতা মাধব চন্দ্র বলেন, ‘কিছু সবজির দাম নাগালে থাকলেও অধিকাংশ পণ্যের দাম চড়া। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ হয়েও অনেক ভেবেচিন্তে বাজার করতে হচ্ছে। যেভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, তাতে আমরা হতাশ।’
আদিতমারীর বুড়ির বাজারের ক্রেতা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘নিজের উৎপাদিত সবজির দাম কম পেলেও বাজারে কিনতে গেলে দাম বেশি দিতে হয়। পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কোনো সিন্ডিকেট থাকা উচিত নয়। বাজার ভারসাম্য রাখতে সরকারের নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন।’
কালীগঞ্জের শিয়াল খাওয়া বাজারের মুরগি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ফিডের দাম বস্তাপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের বিল ও ওষুধের দামও বেড়েছে। তাই খামারে মুরগি তোলার আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই। উৎপাদন কমে যাওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে মুরগি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।’
লালমনিরহাটের বাজারগুলোতে দ্রব্যমূল্য অতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এর মূল কারণ আমদানির ঘাটতি ও তদারকির অভাব। সরকারের উচিত পণ্যের ওপর ট্যাক্স-ভ্যাট কমানো এবং নিয়মিত বাজার তদারকি নিশ্চিত করা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তাদের টিম মাঠে নামলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ লিটন
লালমনিরহাট ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ লিটন বলেন, ‘লালমনিরহাটের বাজারগুলোতে দ্রব্যমূল্য অতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এর মূল কারণ আমদানির ঘাটতি ও তদারকির অভাব। সরকারের উচিত পণ্যের ওপর ট্যাক্স-ভ্যাট কমানো এবং নিয়মিত বাজার তদারকি নিশ্চিত করা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তাদের টিম মাঠে নামলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’



