Logo
Logo
×

সারাদেশ

মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ভিক্ষুক নারী, সোহানার দায়িত্ব নিলেন জেলা প্রশাসক

Icon

নরসিংদী প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১০ পিএম

মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ভিক্ষুক নারী, সোহানার দায়িত্ব নিলেন জেলা প্রশাসক

বয়স মাত্র সাত বছর। শৈশব মানেই নিরাপদ আশ্রয়, স্নেহের পরশ, হাসি-খেলা আর স্বপ্নের সূচনা। যে বয়সে মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে থাকার কথা, বাবার হাত ধরে পৃথিবী চেনার কথা, যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলনা আর রঙিন স্বপ্নে মেতে ওঠে-সেই বয়সেই সোহানার জীবনে নেমে এসেছে কঠিন বাস্তবতা। তার জীবনে শৈশব যেন শুরু থেকেই এক কঠিন সংগ্রামের নাম। জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় সে ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। আপনজনের স্নেহ-নিরাপত্তায় বেড়ে ওঠার বদলে তার দিন কেটেছে নরসিংদী শহরের একটি জীর্ণ বস্তিঘরে, অনিশ্চয়তা আর অবহেলার মধ্যে।

জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুটির নাম সোহানা। যাঁদের কাছে তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার কথা, সেই আপনজনদের কাছ থেকেই সে পরিত্যক্ত হয়েছে। নরসিংদী রেলস্টেশন সংলগ্ন বানিয়াছল এলাকায় রাস্তার পাশের ড্রেন ও আবর্জনার কাছে অসহায় অবস্থায় দিন কাটানোর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করে। নিজের প্রয়োজন কিংবা কষ্টের কথা স্পষ্ট করে বলতে না পারলেও আধো স্বরে আজও বাবা-মাকে ডাকে সোহানা। কিন্তু পাশে নেই সেই ডাকের জবাব দেওয়ার জন্য বাবা-মা। তবে সোহানার এই অসহায় জীবনের গল্পে এখন যুক্ত হয়েছে আশার নতুন অধ্যায়। অন্ধকারের মধ্যেও আলো জ্বলে। সোহানার জীবনে সেই আলো হয়ে এসেছে এক অসহায় নারীর মমতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল উদ্যোগ। আপনজনের আশ্রয় হারানোর মধ্যেও শিশুটিকে একা ফেলে রাখেননি আম্বিয়া বেগম। আম্বিয়া বেগম নামের এই অসহায় নারী নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও নিঃস্বার্থ মমতায় শিশুটিকে আগলে রেখেছেন।  আর এবার তার নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পাশে দাঁড়িয়েছে নরসিংদী জেলা প্রশাসন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) নরসিংদী রেলস্টেশন সংলগ্ন বানিয়াছল এলাকায় সোহানাকে দেখতে যান জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। শিশুটির বর্তমান অবস্থা, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন জেলা প্রশাসক। তাঁর নির্দেশনায় সোহানার প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে সুবর্ণ নাগরিক কার্ডের ব্যবস্থা করা এবং জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসময় জেলা প্রশাসক সোহানার হাতে নতুন পোশাক, খাবার ও শুকনো খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন। পাশাপাশি শিশুটির প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব পালনের জন্য জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সোহানার জন্য এসব উদ্যোগ কেবল তাৎক্ষণিক সহায়তা নয় বরং তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার পাশাপাশি তার আইনগত পরিচয় ও প্রাপ্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথ তৈরি হবে। তবে তার জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, উপযুক্ত পরিচর্যা, নিরাপদ আবাসন এবং বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

এ সময় উপাস্থত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), নরসিংদী সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অন্যান্য প্রতিনিধিরা।

সোহানার ভবিষ্যৎ নিয়েও জেলা প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট। শিশুটির বাবা-মা ও অভিভাবকদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা শিশুকে পরিত্যাগের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। আর যদি শিশুটির বাবা-মা তার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান কিংবা তার নিরাপদ লালন-পালন নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষে জেলা প্রশাসন তার সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি শিশু পরিবারে ভর্তিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দেখভালের আশ্বাসও দেন তিনি।

এদিকে নিজের অভাব ভুলে অন্যের শিশু সোহানাকে আগলে রেখে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে চলা জীবনের এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন আম্বিয়া বেগম। নিজেরই দুবেলা খাবার জোটে না তাঁর। রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে চলে জীবন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরে রয়েছে নানা অসুস্থতার চাপ। প্রতিদিনের জীবন যেখানে তাঁর নিজের জন্যই সংগ্রামের, সেখানে সেই সামান্য সামর্থ্যরে মধ্যেও তিনি সোহানাকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। ভিক্ষা করে পাওয়া সামান্য অর্থ থেকে শিশুটির মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন তার ক্ষুধা ও অসহায়ত্ব কিছুটা হলেও কমাতে। রক্তের সম্পর্ক নেই, নেই আর্থিক সামর্থ্য কিংবা শিশুটিকে বড় করে তোলার পর্যাপ্ত সুযোগ। তবু সোহানার ক্ষুধা ও অসহায়ত্ব তাঁর হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। আপনজনের স্নেহ থেকে বঞ্চিত শিশুটির জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন আপৎকালীন আশ্রয়। এই মমতার মূল্য অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নিজের কষ্টের মধ্যেও অন্যের কষ্ট অনুভব করার যে ক্ষমতা, আম্বিয়া বেগম যেন তারই প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা কি কেবল রক্তের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? সোহানার জীবনে আম্বিয়ার উপস্থিতি যেন সেই প্রশ্নের উত্তর। নিজের কষ্টের মধ্যেও অন্যের কষ্ট অনুভব করার যে ক্ষমতা, সেটিই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।  

জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া আম্বিয়া বেগমের এই মহৎ উদ্যোগের জন্য তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “আম্বিয়া বেগমরাই আমাদের সত্যিকারের বাংলাদেশ। তাঁদের মতো মানুষই আমাদের ভালো কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জোগায়।” একজন অসহায় নারীর এই সামান্য সামর্থ্যের মধ্যেও অসাধারণ মানবিক ভূমিকা সমাজের জন্য এক বড় শিক্ষা। একই সঙ্গে এ ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, মানবিক উদ্যোগের পাশাপাশি এমন মানুষদের প্রতিও সমাজ ও রাষ্ট্রের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যাঁরা নিজেরা সংকটে থেকেও অন্যের পাশে দাঁড়ান।

সোহানার ঘটনায় তার পাশে জেলা প্রশাসনের দাঁড়ানো এবং আম্বিয়া বেগমের নিঃস্বার্থ মমতা নতুন আশার দরজা খুলেছে। এই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি এবং শিশুটির অধিকার রক্ষায় সবার আন্তরিক অংশগ্রহণ। একটি শিশুর অসহায় কান্না যেন আর রাস্তার পাশে, ড্রেনের ধারে কিংবা আবর্জনার স্তূপের কাছে হারিয়ে না যায়। কোনো শিশুকে যেন নিজের পরিচয়, নিরাপত্তা কিংবা চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও যেন সমান মর্যাদা, যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। নরসিংদী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। তবে এ উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতার ওপর। শিশুটির চিকিৎসা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তার আইনগত পরিচয় সম্পন্ন হচ্ছে কি না, নিরাপদ আবাসন ও পরিচর্যার ব্যবস্থা হচ্ছে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত করা যাচ্ছে, তার ওপর। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতি বৈষম্য দূর করা, যেন সমান মর্যাদা, যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে এবং তাঁদের অধিকার সম্পর্কে পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। আর কোন সোহানাকে যেন বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা একাকিত্ব, অবহেলার শিকার হতে না হয়। এর জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

ভিক্ষাবৃত্তি করা আম্বিয়া বেগম জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘ বছর ধরেই নরসিংদী শহরে থেকে অন্যের বাড়িতে কাজের পাশাপাশি ভিক্ষা করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। গত ৫ বছর আগে সাগর-লিজা দম্পতি এই অঞ্চলেই বসবাস করতেন। তাদের দাম্পত্য কলোহ আর অভাব অনটনের ফলে প্রতিবন্ধী এই শিশুটিকে ফেলেই চলে যায় তারা, কোথায় গেছেন সেটিও জানেনা কেউ। এর পর থেকেই নিজের কাছে রেখে লালন-পালন করে আসছিলেন। তিনি আরও জানান, সম্প্রতি প্রতিবেশি শিশুদের কবলে গিয়ে ড্রেনের পাশে পরে গেলে সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে আলোচনায় আসে শিশু এবং তার দায়িত্বে থাকা আমোনার মানবিকতা। স্থানীয়দের কাছে প্রসংশিত হলেও এই শিশু যেন মরার উপর খারার ঘা। বর্তমানে ষাটোর্ধ নারীর বয়স ভারে অপারগতা আর দারিদ্র্যতায় পুরোপুরি দিশেহারা এই নারী। তাই চাইলেন সহযোগীতা।

একটি শিশুকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি জীবনকে বিপদ থেকে ফিরিয়ে আনা নয়, তার সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখা, তার মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। আজ সোহানার পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে সেই দায়িত্বের কথাই আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন