নাফনদীতে কাঠের সাবমেরিনে পাচারকালে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ইয়াবা সহ আটক ৩
কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম
মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে এবার ব্যবহার করা হচ্ছে অভিনব কৌশল। পানির নিচে ডুবিয়ে রাখা সাবমেরিনের ইয়াবা ভর্তি করে ইলেকট্রিক মোটর, স্টিলের তার ও কপিকলের সাহায্যে নাফ নদী পেরিয়ে খালপথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা হচ্ছিল ইয়াবার চালান। এমন একটি চোরাচালান চক্রের ব্যবহৃত সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে বিজিবি। এসময় পিস্তল, গুলি ও ইয়াবা সহ আটক করেছে ৩ জনকে।
মঙ্গলবার বিকালে ৬৪ বিজিবির মিডিয়া হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন, ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম।
আটক ব্যক্তি হলেন- উখিয়া উপজেলার বালুখালী রহমতের বিল এলাকার বাসিন্দার ফরিদের ছেলে মোঃ রকি আহমেদ (২৬), বালুখালী নলবনিয়া এলাকার বাসিন্দার নুর আলমের ছেলে বেলাল উদ্দিন (৩৫), বালুখালী মধ্যম ফারির বিল এলাকার বাসিন্দার খোরশেদ আলম (২৬)।
অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১১ রাউন্ড গুলি, ২ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা এবং ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানান, ১২ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে পালংখালী বিওপির একটি টহল দল উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় মনিরের ঘেরের একটি মাচাং ঘরের পাশে সন্দেহজনক ভাবে ৪ থেকে ৫ জন ব্যক্তিকে দেখতে পায় টহল দল। বিজিবি সদস্যরা তাদের চ্যালেঞ্জ করলে কয়েকজন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ধাওয়া করে দুজনকে আটক করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা ও ঘেরের ঘরে তল্লাশি চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ১১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া একটি মোবাইল ফোন, ৯টি কপিকল, বিশেষ ধরনের একটি ডুবন্ত ক্যারিয়ার, নৌকা টানার জন্য প্রায় দুই কিলোমিটার স্টিলের তার, ডুবন্ত ক্যারিয়ার টানার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ব্যাটারি এবং একটি ইলেকট্রিক মোটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
বিজিবির দাবি, এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে পানির নিচ দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছিল। সরঞ্জাম গুলো পর্যবেক্ষণ করে বিজিবি ধারণা করছে, এ ধরনের একটি ডুবন্ত ক্যারিয়ারের একসঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ ইয়াবা পরিবহন করা সম্ভব।
বিজিবি জানায়, মিয়ানমার থেকে ডুবন্ত ক্যারিয়ারের মাধ্যমে ইয়াবার চালান নাফ নদী পার করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় আনা হতো। এরপর ইলেকট্রিক মোটর, স্টিলের তার ও কপিকলের সাহায্যে ক্যারিয়ারটি পানির নিচ দিয়ে টেনে নেওয়া হতো পালংখালীর ফাইস্যা খাল হয়ে বাংলাদেশের প্রায় এক কিলোমিটার অভ্যন্তরে।
খালটি আঁকাবাঁকা হওয়ায় চোরাকারবারিরা কপিকল ও স্টিলের তার ব্যবহার করে পানির নিচের পথকে কয়েকটি সরল অংশে ভাগ করে নেয়। এতে পানির ওপর থেকে ক্যারিয়াটি সহজে দেখা না গেলেও নির্দিষ্ট পথে সেটি টেনে নেওয়া সম্ভব হতো।
বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চোরাকারবারিদের একজন পানিতে হাত দিয়ে মাছ ধরার অভিনয় করে ডুবন্ত ক্যারিয়ারটি সঙ্গে সঙ্গে চলাচল করত। খালের প্রতিটি বাঁক অতিক্রম করার সময় ছোট কপিকল গুলো বড় স্থায়ী কপিকল থেকে খুলে নিয়ে পরবর্তী অংশে স্থাপন করা হতো। এভাবে ধাপে ধাপে ক্যারিয়ারটি মিয়ানমার সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার অভ্যন্তরে নিয়ে আসা সম্ভব হতো। এর আগেও নৌপথে ডুবিয়ে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা চালায়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্ৰহণ করে উখিয়া থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে, এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় নৌকার মাধ্যমে রশি দিয়ে ইয়াবার চালান পানিতে ডুবিয়ে টেনে নেওয়ার সময় ১৪ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। এবারও একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলের আরও উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে বিজিবি।
উল্লেখ্য, উখিয়া ব্যাটালিয়ন ৬৪ বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মাদকবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে আনুমানিক ১ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২২৮ জনকে আটক করা হয়েছে।



