থানায় বসে টাকার বিনিময়ে ফয়সালা করলেন ওসি, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মামলা
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে থানায় বসে অর্থ লেনদেন এবং পরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চিলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমারের বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মো. রহমত আলী ওরফে শামীম। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি বলেছেন, একটি মামলায় চাপ সৃষ্টি করতেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শামীম একটি জমি কেনার পর জমিটির একাংশে বিপ্লব মিয়া ও তার পরিবারকে বসবাসের সুযোগ দেন। পরবর্তীতে জমিটি প্রয়োজন হওয়ায় ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বললে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি মীমাংসার জন্য কয়েক দফা বৈঠকের পর গত ২০ সেপ্টেম্বর চিলমারী থানায় বৈঠক হয়।
শামীমের অভিযোগ, ওই বৈঠকে ওসি নয়ন কুমার সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল বারী সরকার, সদস্য সচিব আবু হানিফা, যুগ্ম আহ্বায়ক যোবাইদুল ইসলাম সুইট, উলিপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এরশাদুল হক নয়নসহ স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
শামীম দাবি করেন, জমির বিষয়টি মীমাংসা করে দেওয়ার কথা বলে এর আগে ওসি তার কাছ থেকে চার কিস্তিতে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নেন। তার ভাষ্য, কাগজপত্র দেখে ওসি জমিটি উদ্ধারে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, থানায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে মানবিক দিক বিবেচনা করে বিপ্লব মিয়াকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার জন্য মোট ৩ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে বৈঠক চলাকালে ওসির হাতে ১ লাখ টাকা দেওয়া হয় বলে দাবি করেন শামীম। বাকি ২ লাখ টাকা ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার পর দেওয়ার কথা ছিল।
চিলমারী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক যোবাইদুল ইসলাম সুইট বলেন, থানায় মিটিংয়ের পর মানবিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হয়, শামীম বিপ্লব মিয়াকে বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার জন্য ৩ লাখ টাকা দেবেন। কথা অনুযায়ী শামীম ১ লাখ টাকা ওসির হাতে দেন। আমি ওই ১ লাখ টাকা নিজের হাতে বিপ্লবকে বুঝিয়ে দিই। বাকি ২ লাখ টাকা ২৮ তারিখে বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার পর দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ২৬ তারিখে অগ্নিসংযোগ ও গর্ভের সন্তান হারানোর অভিযোগ করেন বিপ্লব মিয়া।
সমঝোতা অনুযায়ী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিপ্লব মিয়া ও তার পরিবারের ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও এর একদিন আগে, ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে বিপ্লবের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে বিপ্লবের স্ত্রীকে মারধর, হাত-পা বেঁধে রাখা ও পরনের কাপড় নষ্ট করার অভিযোগও ওঠে।
শামীম দাবি করেন, এসব ঘটনায় তার লোকজন জড়িত-এমন অভিযোগ তুলে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করা হচ্ছে। তাকে ফাঁসাতেই পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে অগ্নিসংযোগ বা হামলার সঙ্গে তিনি কিংবা তার পরিবারের কেউ জড়িত নন বলে দাবি করেন শামীম।
তিনি বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় থানায় বসে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতার উদ্যোগ এবং এরপর প্রতিপক্ষের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এ ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে শামীমের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চিলমারী থানার ওসি নয়ন কুমার। তিনি বলেন, এখানে টাকা-পয়সা নেওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। তারা একটি মামলায় পড়েছে। আমাকে প্রেসার ক্রিয়েট করার জন্যই এ ধরনের কথা বলছে।
মামলার বিষয়ে ওসি বলেন, বিপ্লবের বাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তে মামলা রুজু করার মতো তথ্য পাওয়ায় অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে শামীমের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিপ্লব মিয়া বলেন, শামীম যদি আইনগতভাবে জমিটি পেয়ে থাকে, তাহলে সে জমি নেবে-এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আমার বাড়িতে কয়েকবার হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। আমার পরিবারের ওপরও নির্যাতন করা হয়েছে। এতে আমার স্ত্রী গর্ভের সন্তান হারিয়েছেন বলে আমি অভিযোগ করছি। এসব অত্যাচার ও ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি বলেন, চিলমারী থানার নয়ন কুমারের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট সার্কেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



