Logo
Logo
×

সারাদেশ

রোহিঙ্গাদের মানববন্ধন: জাতিসংঘের অধিবেশনে ঘরে ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি

Icon

কক্সবাজার প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

রোহিঙ্গাদের মানববন্ধন: জাতিসংঘের অধিবেশনে ঘরে ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি

‘নয় বছর অনেক দীর্ঘ, আর কোনো অনির্দিষ্টকালীন বাস্তুচ্যুতি নয়;  রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির এখনই সময়’—এমন আহ্বান জানিয়েছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার জামতলী ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউসিআরের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত জীবন কাটছে বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করলেও সংকট সমাধানে প্রত্যাশিত কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়। তাই শুধু সহমর্মিতা বা প্রতিশ্রুতি নয়, প্রত্যাবাসনের জন্য এখন একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোড়ম্যাপ প্রয়োজন।

এতে বক্তারা বলেন, জাতিসংঘের চলমান অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোড়ম্যাপের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধ, মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং বিচার ও জবাবদিহি জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। ফলে এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মাতৃভূমিতে ফেরার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হলে সহিংসতা ও নিপীড়ন বন্ধের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

ইউসিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সময়ভিত্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য রোড়ম্যাপ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা ও নিপীড়নের বিচার এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রমসহ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ভূমিকা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।

ইউসিআরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৌলভী সাইদ উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করে আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের সময় এসেছে। রোহিঙ্গাদের আর অনির্দিষ্টকাল শিবিরে আটকে রেখে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মো. সোইব বলেন, প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গারা নিজ মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু আলোচনা নয়, মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফিরে যেতে পারেন।

রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুবার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো শিবিরেই রয়ে গেছি। তাই এবার জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের একটি সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক রোড়ম্যাপ তৈরি করতে হবে।’

রোহিঙ্গা নারী নেত্রী সাজিদা বেগম বলেন, ‘রোহিঙ্গা নারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত জীবনের নানা সংকট মোকাবিলা করছেন। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘ হবে।’

১৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা নুরুজ্জামা বলেন, ‘আমরা নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চাই। দীর্ঘ নয় বছর ধরে বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবন যাপন করছি। আমরা বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু নিজেদের দেশ, ঘরবাড়ি ও স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে চাই। নিরাপদভাবে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’

রোহিঙ্গা নেতা মো. সালেহ বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি অবহেলিত জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এ অবস্থা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব আমাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’

রোহিঙ্গা নেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জাতিসংঘের চলমান অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকায় আমাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আমরা নিজেরা তুলে ধরতে পারছি না। তাই রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে আমরা জানাতে চাই—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বিশ্বনেতাদের সামনে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। এতে বিশ্বনেতারা কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে এগিয়ে আসতে পারবেন।’

নুর আলম নামের আরেক রোহিঙ্গা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশ ও আরাকানের সমস্যা নয়। এটি একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যা। দ্রুত সময়ের মধ্যে এর সমাধান না হলে সংকট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে। এতে বাংলাদেশসহ আশপাশের অঞ্চলও ভুক্তভোগী হবে। তাই প্রত্যাবাসন ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’

সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতে যে ধরনের নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

ইউসিআরের নেতারা জাতিসংঘ, আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষ, সদস্য রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

তাঁরা বলেন, রোহিঙ্গারা স্থায়ীভাবে শরণার্থী হয়ে থাকতে চান না। তারা নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চান। সেই প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন