Logo
Logo
×

সারাদেশ

খাগড়াছড়িতে ফলন ভালো হলেও কমছে জুম চাষ

Icon

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

খাগড়াছড়িতে ফলন ভালো হলেও কমছে জুম চাষ

আশ্বিনের শুরুতেই পাকা ধানে হলুদ হয়ে উঠেছে খাগড়াছড়ির রিছাং ঝরনার লাগোয়া উঁচু পাহাড়ের চূড়াগুলো। চৈত্র-বৈশাখ মাস থেকেই এসব পাহাড়ে ফসল বুনে পরিচর্যা শুরু করেছিলেন জুমচাষিরা। এখন কষ্টের ফসল পেতে শুরু করলেও রয়ে গেছে কাঙ্খিত দাম না পাওয়া শঙ্কা।

জুমের ক্ষেতের পাকা ধান খেতে আসা লাল বুক টিয়া তাড়ানোর ব্যস্ততার ফাঁকে ৫৫ বছর বয়সি হেমেন্দ্র ত্রিপুরা বলছিলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পাহাড়ে জুমের ফলন ভালো হয়েছে।তবে পাহাড়ে ওঠানামা কষ্টসাধ্য। যে কষ্ট করে ফসল ফলাই, সে তুলনায় বাজারে দাম পাই না।

তিনি বলেন, এবার আমি ধান ছাড়াও হলুদ, আদা, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, আমিলা, তিল, চিনাল, ভুট্টামরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করেছি। এগুলো বিক্রি করেই সংসার চলে। তবে ধানটা বাজারে বিক্রি করি না। সেটা দিয়ে পরিবারের সারা বছরের চালের চাহিদা পূরণ করি।

হেমেন্দ্র ত্রিপুরার মতো খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ জুম চাষ করেন। জুমকে বলা হয় স্থানারিত চাষাবাদ, অর্থাৎ একই জমিতে ৫ থেকে ১০ বছর চাষাবাদ।

জুমে এখনো ফসলে বৈচিত্র্য ধরে রেখেছেন চাষিরা। পাহাড়ের ঢালে জুম পদ্ধতিতে তারা প্রায় ৪০ ধরনের ফসল আবাদ করেন। সেসব খাদ্য-শস্য দিয়ে পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিক্রির আয়ে সংসার চালান তারা।

তবে অতীতের তুলনায় জেলায় জুমের আবাদের পরিমাণ কমে এসেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ফলের বাগান বৃদ্ধি, সেগুন, গামারিসহ বিভিন্ন বাগান সম্প্রসারণ, সংক্ষিপ্ত জুমচক্রসহ নানা কারণে কমছে জুমের চাষাবাদ।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরেই জেলায় জুম চাষের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। কৃষিবিভাগ নানাভাবে চাষিদের সহায়তা করে চাষে উদ্বুব্ধ করার চেষ্টা করছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, গত ৫ বছরে জুমের আবাদ ক্রমশ কমেছে। ২০২১-২২ সালে খাগড়াছড়িতে ১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়। ২০২২-২৩ সালে চাষ হয় ১ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে।

এরপর ২০২৩-২৪ সালে ১ হাজার ৫৯ হেক্টর জমিতে, ২০২৪-২৫ সালে ১ হাজার ১২৪ হেক্টর জমিতে এবং ২০২৫-২৬ সালে ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে।

দীঘিনালার সীমানাপাড়ার জুমচাষী সুধাং ত্রিপুরা বলেন, “অনেক বছর ধরে জুম চাষ করছি। আমার নিজের জমি। অনেক রকমের সবজি ও ধান লাগিয়েছি। তবে আগের মতো আবাদ হয় না। কীভাবে, জমি তো নাই। বেশির ভাগ পাহাড়ে এখন সেগুন বাগান।”

সীমানাপাড়া এলাকার কার্বারি (পাড়ার প্রধান) চয়ন ত্রিপুরা বলেন, “আমাদের এই দুর্গম এলাকায় আমরা আগে থেকে জুম করে খেতাম। এখন বর্তমান যুগে অনেক বাগান বাড়ি হয়েছে। সেগুন বাগান হয়েছে। বিভিন্ন গাছ গাছালি রোপণ হয়েছে। আর এজন্য আমাদের জুম চাষি কমে গেছে।

“আর লোক সংখ্যা বাড়তেছে, কিন্তু জায়গা বাড়ে নাই। এজন্য মোটামুটি বলতে গেলে আমাদের জুম চাষ অনেক কমে গেছে।”

দীঘিনালার নয় মাইল এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গণেশ ত্রিপুরা বলেন “গতবারের চেয়ে এবারও একটু জুম চাষ কমে গেছে। যারা জুম চাষ করে, এরা সরকারের কাছে কোনো কৃষিঋণ পায় না। কীটনাশক, সার কোনো কিছুই পায় না। যদি সরকার ঋণ সহায়তা, সার দিয়ে দেয়, কীটনাশক দেয়, তাহলে এরা আরও একটু এগিয়ে আসতে পারবে।”

তবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, এ বছর তারা ১৫০০ জুম চাষির মাঝে ৫ কেজি ধানের বীজ ও ২০ কেজি সার বিতরণ করেছেন।

জুম ধানের নতুন জাতে সাফল্য

এদিকে জুমচাষিদের উৎপাদন বাড়াতে নতুন দুটি জাত নিয়ে গবেষণায় সাফল্য আসার দাবি করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট।

গবেষণার অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ির দুই চাষীর জুমে নতুন জাত নিয়ে গবেষণা করেছে তারা।

তাদের মধ্যে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়ক লাগায়ো নয় মাইল এলাকায় ধানের চাষ করেছেন খমলা ত্রিপুরা। সম্প্রতি তার জুমে গিয়ে দেখা যায় পাঁচ নারী শ্রমিক জুমের পাকা ধান কাটছেন।

খমলা বলেন, তাদের নিজস্ব স্থানীয় জাত ‘কোম্পানি ধানের’ তুলনায় ব্রি-৮৩ এর ভালো ফলন হয়েছে।

জুমের ক্ষেতে ধানের পাশাপাশি আমিলার চারা (রোজালা), মারফা ও চিনাল চাষ করেছেন তিনি।

ইনস্টিটিউটের এলএসটিডি প্রকল্পের এ গবেষণার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মীর ওবায়দুর রহমান বলেন, জুম চাষের বিদ্যমান পদ্ধতি, জুমে উপোযোগী ধানের জাত নির্বাচন, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, পোকার আক্রমণ, সুষম সার ব্যবস্থাপনার অভাব, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ইত্যাদির কারণে অধিকাংশ জুমচাষী কাঙ্খিত ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং জুম চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

তাই জুম চাষের উপযোগী ধানের জাত চিহ্নিতকরণ, জুমভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় ধানের অভিযোজন সক্ষমতা ও উৎপাদন সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা এবং পাহাড়ে জুম চাষকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য পাহাড়ের মাটির গুনাগুণ বৃদ্ধি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং এই অঞ্চলের জন্য কার্যকর কৃষি পদ্ধতি নির্ধারণ করা এ গবেষণার মূল লক্ষ এবং উদ্দেশ্য।

তিনি জানান, আউশ মৌসুমে স্থানীয় জুম চাষী খমলা ত্রিপুরা ও রন্টু চাকমার প্রায় চার একর পাহাড়ে এই জুম গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় ব্রি উদ্ভাবিত জুম চাষের উপযোগী ধানের জাত ব্রি-৮৩ ও স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় দুটি জাত বিন্নি ধান ও কোম্পানি ধান ব্যবহার করা হয়েছে।

সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তে দেখা যায় জুমচাষি খমলা ত্রিপুরার জমিতে ব্রি-৮৩ এর গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ৫৭ টন। অন্যদিকে স্থানীয় কোম্পানি ধানের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ২ দশমিক ৪৭ টন।

এছাড়া জুমচাষি রন্টু চাকমার জমিতে ব্রি-৮৩ চাষ করে হেক্টর প্রতি ৩ দশমিক ২৪ টন ফলন হয়েছে এবং স্থানীয় বিন্নি ধানের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ১ দশমিক ৫৩ টন।

মীর ওবায়দুর বলেন, “আমরা যে গবেষণা করেছি, তাতে দেখা গেছে ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাতের ফলন স্থানীয় ধানের জাতের চেয়ে অনেক বেশি এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ অপেক্ষাকৃত কম।”

গবেষণায় জুমে ধানের পাশাপাশি মিক্সড ক্রপ হিসেবে মারফা (স্থানীয় শশা), আদা, হলুদ, ভুট্টা, রোজেলা ইত্যাদি চাষ করা হয়।

এলএসটিডির প্রকল্প পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “জুম চাষাবাদকে কেন্দ্র করে বিন্নি ধানকেও আমাদের যে বায়োটেকনোলজি বিভাগ আছে, তার মাধ্যমে একটি নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছি। সেই জাতটি ভিটামিন ‘ই’ সমৃদ্ধ এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হবে।

“আশা করি, প্রকল্পের মেয়াদে আমরা জাতটিকে অবমুক্ত করতে সক্ষম হব। এর ফলন প্রতি হেক্টরে ৫ থেকে ৬ টনের বেশি। জাতটি যদি আমরা অবমুক্ত করি, তাহলে পার্বত্য এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হবে।”

জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, “জুম চাষ কেবল একটি কৃষি ব্যবস্থা নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য, জীবিকা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু ভূমির সংকোচন, বসতি ও বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তার, সংক্ষিপ্ত জুমচক্র, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা এবং তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহে এ কৃষিপদ্ধতি আজ সংকটে।”

তিনি বলেন, “একই জমিতে দ্রুত পুনরায় চাষ করায় মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা কমছে। তবে দীর্ঘ পতিতকাল, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বহুফসলি চাষ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জুমকে টেকসই করা সম্ভব।

“এছাড়া জুমচাষিদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি, কৃষি প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত হলে তা জুমকেন্দ্রিক জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন