টেকনাফের এপিবিএন সদস্য মুন্নাকে ঘিরে পারিবারিক মাদক কারবারের অভিযোগ
কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম সিকদার পাড়ার তরুণ মোহাম্মদ আলী মুন্না সিকদার। এলাকায় পরিচিত ‘মুন্না সিকদার’ নামে। বয়স মাত্র ২৭ বছর। প্রায় পাঁচ বছর আগে পুলিশ সদস্য হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন)।
পুলিশের পোশাক পরা এই তরুণ সদস্যই এবার ধরা পড়েছেন বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ। গত ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে কক্সবাজারের রামুর মরিচ্যা যৌথ চেকপোস্ট এলাকায় বিজিবির অভিযানে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ আটক হন তিনি। তাঁর কাছ থেকে ইয়াবার পাশাপাশি একটি মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন ও নগদ ৫০ হাজার ৯৯০ টাকা জব্দ করা হয়েছে বলে বিজিবির এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজিবির অভিযোগ, মোটরসাইকেলযোগে ইয়াবা পাচারের সময় তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে রামু থানায় সোপর্দ করে মামলা করা হলে পুলিশ আদালতে পাঠায়। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মুন্না সিকদারের বড় ভাই দিল মোহাম্মদ সিকদার দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁর নিয়ন্ত্রণে হ্নীলা বাজারের ‘সিকদার প্লাজা’ মাদক মজুত ও লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই পারিবারিক মাদক কারবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে মুন্না সিকদারকে পুলিশে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয়দের দাবি, ১৬ এপিবিএনে কর্মরত থাকার সময়ও মুন্না সিকদারকে প্রায়ই নিজ এলাকা পশ্চিম সিকদার পাড়া ও হ্নীলা বাজারে দেখা যেত। কর্মস্থল রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় হলেও গ্রামের বাড়ি ও সিকদার প্লাজায় তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলে দাবি তাঁদের।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিলাসবহুল গাড়ি ও মোটরসাইকেলে চলাফেরা করতেন তিনি। হ্নীলা থেকে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
১৬ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ কাউসার সিদ্দিকী জানান, ইয়াবাসহ আটক মোহাম্মদ আলী মুন্না তাঁদের ব্যাটালিয়নের সদস্য। তিনি ২১ দিনের ছুটিতে ছিলেন। এরই মধ্যে মুন্নাকে ১৬ এপিবিএন থেকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছিল। তবে নতুন কর্মস্থলে তিনি এখনো যোগদান করেননি। ছুটিতে থাকা অবস্থাতেই এ ধরনের অপরাধে জড়িয়েছেন বলে জানান তিনি।
৫৪ হাজার ইয়াবা সাধারণ কোনো ব্যক্তিগত বহনযোগ্য চালান নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে তাই শুধু বাহক হিসেবে মুন্নার ভূমিকা নয়, চালানটির উৎস, গন্তব্য, অর্থের জোগান, যোগাযোগকারী এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মুন্না সিকদারের বড় ভাই দিল মোহাম্মদ সিকদার। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিকদার পরিবারকে ঘিরে এলাকায় মাদক কারবারের আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হ্নীলা বাজারে অবস্থিত সিকদার প্লাজা দিল মোহাম্মদ সিকদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ভবনটির বিভিন্ন অংশ মাদক মজুতের কাজে ব্যবহার করা হয়।
স্থানীয়দের আরও দাবি, টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবার একটি অংশ বিভিন্ন কৌশলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের সঙ্গে এই চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
মুন্না সিকদার আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথিত মাদক কারবারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু মুন্নাকে গ্রেপ্তার করে তদন্ত শেষ করলে চলবে না। তাঁর সঙ্গে কারা জড়িত, ইয়াবার চালানটি কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাওয়ার কথা ছিল এবং অর্থের উৎস কী, এসব বের করতে হবে।
একই সঙ্গে সিকদার প্লাজা ও তাঁর বড় ভাই দিল মোহাম্মদ সিকদারের কথিত মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা পাচারের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে আলোচিত। সীমান্ত দিয়ে আসা মাদকের চালান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে একাধিক হাতবদল হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কেউ কেউ এই চক্রে জড়িয়ে পড়লে পুরো পাচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযান আরও জটিল হয়ে পড়ে।
মুন্না সিকদারের ঘটনায় তাই একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি কি কেবল একজন পুলিশ সদস্য, যিনি ব্যক্তিগতভাবে মাদক বহন করছিলেন, নাকি তাঁর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ কোনো মাদক সিন্ডিকেট?
এই প্রশ্নের উত্তর মিলতে হলে তদন্তে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা, সিকদার প্লাজার কার্যক্রম, তাঁর আর্থিক লেনদেন, মুঠোফোন যোগাযোগ, গত কয়েক মাসের চলাচল এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।



