অন্যের মৃত্যুদণ্ডের হুলিয়া নিয়ে ১ মাস ২১ দিন কারাগারভোগ শেষে মুক্ত আলোয় সোনা মিয়া
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
অপরাধ না করেও মাদকের মামলায় ভিন্ন এক আয়নাবাজির শিকার হয়ে মৃত্যুদণ্ডের হুলিয়া নিয়ে ১ মাস ২১ দিন কারাগারের ছিলেন কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত নজির আহমদের ছেলে সোনা মিয়া।
নানা প্রক্রিয়া শেষে আদালতের দেওয়া ৪ টি শর্তের সিদ্ধান্তে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় সোনা মিয়া কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন, জেলা সুপার মো. ওবায়াদুর রহমান।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর সোনা মিয়া নিজের দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে মন্তব্য করে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব করা মহাপাপের। এই পাপ যেন কেউ না করেন।’
সোনা মিয়া জানান, গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সোনা মিয়া জানতেন না গ্রেপ্তারের কারণ। কারাগারের যাওয়ার পর জানতে পারেন ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া একটি মামলার আসামি তিনি। কি এই মামলা তা জানার পর রহস্য বুঝতে পারেন। এরপর জেলা সুপার বরাবরে নিজের বিষয় পরিষ্কার করে আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনি মুক্তি পান।
মুক্তির পর তিনি আইনজীবী, পুলিশ, গণমাধ্যমকর্মী এবং জেলা সুপারের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মূলত ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পুলিশের এক অভিযানে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন ৫ জন। যে মামলার এজাহারের ২ নম্বর আসামি নাম সোনা মিয়া। যেখানে পিতার নাম লেখা হয় নজির আহমদ এবং বর্তমান ঠিকানা ছিল কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া। স্থায়ী ঠিকানা ছিল রামু উপজেলার গর্জনিয়া। অভিযানের সময় ওই ব্যক্তি কাছে পাওয়া একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির সূত্র ধরে সোনা মিয়ার নামটি ব্যবহারের কথা এজাহারের উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালত থেকে পাওয়া নথিপত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই সময়ের ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র ( চার্জশিট) দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২ নম্বর আসামির নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ অনুসন্ধান করেছে। অনুসন্ধানে ‘সোনা মিয়া’র দেওয়া নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য অনুরোধ করা হয়।
কিন্তু নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরমধ্যে এরপর দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত ওই মামলায় ‘সোনা মিয়াসহ’ সংশ্লিষ্ট ৫ আসামিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একজন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টমূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর নতুন করে সামনে আসে প্রশ্ন। কারাগারে যাওয়ার ২/৩ দিন পর ‘সোনা মিয়া’ কারাগারের জেল সুপার বরাবর আবেদন করেন যে, তিনি এই মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার বিষয়টি জেলা জজ, কক্সবাজারের কাছে পাঠিয়ে দেন। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। গত ২ জুলাই কক্সবাজার সদর থানার পুলিশ আদালতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।
আর যেখানে উঠে এসেছে ২০২০ সাথে ইয়াবা সহ গ্রেপ্তার এবং জামিনপ্রাপ্ত সোনা মিয়া মামলার রায় ঘোষণার পর র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ঘটনার প্রথমে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে গ্রেপ্তার থাকা ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘটনার সময় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে ২ নম্বর আসামির প্রকৃত নাম ছিল রমজান। তিনি নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ বলে পুলিশের কাছে পরিচয় দেন এবং পরে পুলিশকে একটি জন্মনিবন্ধন কার্ড দেখান। রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়া পাড়ায় দীর্ঘদিন একসঙ্গে একই ঘরে অবস্থান করেন। কোন এক কারণে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনটি রমজান তার কাছে রাখতেন।
কারাগারের সূত্র প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের পর হাজতে থাকা ব্যক্তি এবং সাজা হওয়ার পর গ্রেপ্তার ব্যক্তির পরিচয়েও মিলেছে ভিন্নতা। ২০২০ গ্রেপ্তারের পর কারাগারে সংরক্ষিত ছবি, ২৩ জুন গ্রেপ্তারের পর নেয়া ছবি রয়েছে ভিন্নতা। একই সঙ্গে ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পিতা নাম মৃত নজির আহমদ, মাতা সোনারা বেগম, স্ত্রী আয়েশা, দুই ছেলে দুই মেয়ে, ছেলে নাম মোহাম্মদ আলী, উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি, শ্যামলা এবং শনাক্ত করণের চিহ্ন হিসেবে বাম গালে ক্ষত, ডান গালে ক্ষত, ডান বাহুতে ক্ষত রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
২৩ জুন গ্রেপ্তার সোনা মিয়ার পিতা নাম মৃত নজির আহমদ হলেও মাতার নাম মাহমুদা খাতুন, স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস, এক ছেলে, তিন মেয়ে, ছেলে ওমর ফারুক ও মেয়ে নাহিদা লেখা রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি, শ্যামলা এবং শনাক্ত করণের চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বামে তিল, পিঠের মাঝে তিল রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশ প্রতিবেদনটি আদালতে আসলে ১২ আগস্ট সোনা মিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত দেন আদালত।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান জানান, কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে দেয়া ৪ টি শর্ত হল, কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার আইডি কার্ড জমা প্রদান, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা প্রদান, কোনোভাবে দেশ ত্যাগ না করা, একই সঙ্গে ৩ মাস পর পর আদালতে হাজির হওয়া।
একই সঙ্গে এ ঘটনায় মূল আসামিকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করতে পুলিশকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মামলাটি দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল সহ পুরো বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি রয়েছে। কোনো এক ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন নিয়ে অন্য কেউ ওই নামে পরিচয় দিলে তা বের করার দায়িত্ব পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তার। এই মামলার ক্ষেত্রে সোনা মিয়ার প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা যায়নি বলে অভিযোগপত্র দাখিল করে দায়হীনতা দেখিয়েছে। এমন কি ওই ব্যক্তির প্রকৃত নাম যে রমজান তাও বের করা হয়নি। নানা কৌশলে প্রকৃত আসামি জামিনে মুক্ত, পালাতক, পরে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হল। কিন্তু এক সোনা মিয়াকে খোঁজে বের রে কারাগারে পাঠানো হল। সোনা মিয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের প্রহর গুণছেন। এর মধ্যে আবেদনের সংরক্ষিত ২০২০ সালের তথ্য এবং ২০২৬ সালের তথ্য মিলিয়ে দেখা গেল ভিন্নতা। আদালতের আদেশে সোনা মিয়ার নাম ব্যবহারকারী রমজান নামের ব্যক্তিকে আনা হল প্রকাশ্যে।
আদালতের আদেশে প্রতিবেদন দাখিলের সত্যতা স্বীকার করেছেন কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, পুলিশ দীর্ঘ তদন্তে সোনা মিয়া নাম ব্যবহার করে রমজান নামের এই ব্যক্তি আয়নাবাজির ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা উঠে এসেছে। আদালতের মুক্তির আদেশটি হাতে পেয়েছেন। আদালতের নির্দেশ মতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।



