জব্দ করা দুই কোটি টাকার জালের হদিস নেই, মৎস্য কর্মকর্তা বলছেন ‘কিছু জাল মিছিং হয়েছে’
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:০২ পিএম
নরসিংদীর মাধবদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের নিষিদ্ধ মাছ ধরার জাল জব্দের সরকারি দাবি ঘিরে দেখা দিয়েছে রহস্য। জব্দ করা জালের বিপরীতে আগুনে পোড়ানো হয়েছে মাত্র কয়েক লাখ টাকার জাল, এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা।
বিস্ময়কর বিষয়, জব্দকৃত জালের পরিমাণ ও মূল্য নিয়ে দুই সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যে মিল নেই। এরই মধ্যে সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, কিছু জাল মিছিং হয়েছে যা ঘটনাটিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মাধবদী পৌর প্রশাসক আসমা জাহান সরকারের নেতৃত্বে মাধবদী বাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কারেন্ট ও রিং জাল জব্দ করা হয়।
অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সাথে ব্রিফিংয়ে ইউএনও দাবি করেন, প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই জাল ব্যবসায়ীকে মৎস্য আইন অনুযায়ী মোট ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
কিন্তু ওই দিনই দুপুরে মদনগঞ্জ সড়কের পাশে যে জাল আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়, তা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সেখানে যে পরিমাণ জাল পোড়ানো হয়েছে, তার মূল্য সর্বোচ্চ এক থেকে দুই লাখ টাকার বেশি নয়। ঘোষিত বিপুল পরিমাণ জালের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে পোড়ানো জালের কোনো মিল তারা দেখেননি।
স্থানীয় বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, ইউএনও নিজেই বলেছেন প্রায় দুই কোটি টাকার জাল জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু আগুনে পোড়ানো হয়েছে কয়েকটি ভ্যানে আনা অল্প কিছু পুরোনো জাল। এগুলোর মূল্য দুই লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তাহলে বাকি জাল কোথায় গেল? বিষয়টি খুবই রহস্যজনক।
ঘটনার পর সরকারি বক্তব্যেও দেখা গেছে অসঙ্গতি। ইউএনও আসমা জাহান সরকার জব্দ করা জালের মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা বলে দাবি করলেও সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রওনক জাহান বলেন, জব্দ করা জালের মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ব্যবধান নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে ৫ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। প্রতি মিটার ৩০ টাকা হিসেবে যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া ৪৮০টি রিং জাল জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৭ লাখ টাকা।
এদিকে আলোচিত বক্তব্য এসেছে সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রওনক জাহানের কাছ থেকে। তিনি বলেন, আমাদের হেফাজতে কোনো জাল নেই। সব জালই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে পুড়ানোর জায়গা কয়েকবার পরিবর্তন করতে হয়েছে। স্থান পরিবর্তনের সময় কিছু জাল মিছিং হয়ে থাকতে পারে বলে আমার ধারণা।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, যদি জব্দ করা আলামতের একটি অংশ সত্যিই নিখোঁজ হয়ে থাকে, তবে সেটি কীভাবে হলো, কার দায়িত্বে ছিল এবং তার কোনো তদন্ত হবে কি না?
অন্যদিকে ইউএনও আসমা জাহান সরকার দাবি করেছেন, জব্দ করা সব জালই আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। তার সংরক্ষণে কোনো জাল নেই বলেও তিনি জানান। স্থানীয়দের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ জালের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে অবগত নন। মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই জব্দ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি।
জব্দ করা সম্পূর্ণ জাল কি সত্যিই ধ্বংস করা হয়েছে?
যদি হয়ে থাকে, তবে দৃশ্যমানভাবে এত অল্প পরিমাণ জাল কেন পোড়ানো হলো? মিছিং হওয়া জালের দায়ভার কার? দুই সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যে জব্দকৃত জালের মূল্যে এত বড় পার্থক্য কেন?
জব্দ, সংরক্ষণ ও ধ্বংসের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং নথিপত্র কি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না মেলায় ঘটনাটি ঘিরে নরসিংদীজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। জব্দ করা বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ জালের প্রকৃত পরিণতি এবং সরকারি বক্তব্যের অসঙ্গতি দূর করতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যাখ্যার দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।



