আইনজীবীদের কর্মসূচিতে কিশোরগঞ্জ কর অফিসে সেবা ব্যাহত
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
কিশোরগঞ্জ কর অফিসে কর্মরত অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, করদাতা ও আইনজীবীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং মারমুখী আচরণের অভিযোগ তুলে টানা কর্মবিরতি ও কর অফিস বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অবিলম্বে অন্যত্র বদলির দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন তারা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অগ্রিম কর, বকেয়া কর, কর রিটার্ন দাখিল, কর নির্ধারণ, আপিল, শুনানিসহ সব ধরনের আয়কর কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন আইনজীবীরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) সরেজমিনে কিশোরগঞ্জ কর অফিসে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথারীতি উপস্থিত থাকলেও আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে অধিকাংশ কর-সংক্রান্ত কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কর রিটার্ন দাখিল, কর নির্ধারণ, আপত্তি নিষ্পত্তি, অগ্রিম ও বকেয়া কর পরিশোধ, আপিল শুনানিসহ বিভিন্ন কাজে আসা শত শত করদাতা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
কর অফিস সূত্র জানায়, আইনজীবীদের অংশগ্রহণ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অনেক কর-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক করদাতা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে কর আদায় ব্যাহত হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আহরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
যেভাবে শুরু বিরোধ
জানা গেছে, গত ৫ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম শহরের কয়েকজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে যান। সেখানে কর কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে বলেন—এমন অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতির নেতারা তার কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাখ্যা চান।
এ সময় জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, তিনি কর কমিশনারের অনুমতি নিয়েই চিকিৎসকদের চেম্বারে গিয়েছিলেন। তবে আইনজীবীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য অনভিপ্রেত ও নৈতিকতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন।
একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কর আইনজীবী সমিতির অভিযোগ, জাহাঙ্গীর আলম চেয়ার থেকে উঠে টুপি ও পাঞ্জাবি খুলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিনের দিকে তেড়ে যান। পরে উপস্থিত আইনজীবী ও করদাতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ঘটনার পর জরুরি সভা করে কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতি অভিযুক্ত কর্মকর্তার বদলি না হওয়া পর্যন্ত কর অফিস বর্জন এবং সব ধরনের আয়কর কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে বিষয়টি লিখিতভাবে নরসিংদী কর জোনের কমিশনারকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
দুর্ভোগে সাধারণ করদাতা
আইনজীবীদের কর্মসূচির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ করদাতারা।
করদাতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আজ কর রিটার্ন সংক্রান্ত একটি কাজ করতে এসেছিলাম। কিন্তু আইনজীবীরা কর্মসূচিতে থাকায় কাজ করতে পারলাম না। বারবার অফিসে আসতে হচ্ছে, এতে সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
আরেক করদাতা শারমিন আক্তার বলেন, সরকারকে আমরা নিয়মিত কর দিই। কিন্তু অফিসে এসে যদি সেবা না পাই, তাহলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও করের কাজ করতে সময় বের করে অফিসে এসেছি। কিন্তু কাজ না হওয়ায় আবারও আসতে হবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করা।
কিশোরগঞ্জ কর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলমের আচরণগত সমস্যা রয়েছে। তিনি করদাতা ও আইনজীবীদের সঙ্গে প্রায়ই উদ্ধত ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এমনকি সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে দায়িত্বশীল, শালীন ও পেশাদার আচরণ প্রত্যাশা করি। কিন্তু তার আচরণে আইনজীবী সমাজ চরমভাবে ক্ষুব্ধ। তাই তাকে অন্যত্র বদলি না করা পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে এবং কোনো আইনজীবী আয়কর-সংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশ নেবেন না।
সালাহউদ্দিনের দাবি, এই কর্মসূচির কারণে অগ্রিম কর, বকেয়া কর, কর রিটার্ন দাখিল, কর নির্ধারণ ও আপিল শুনানিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হচ্ছে। নতুন কর্মকর্তা দায়িত্ব নিলে তারা আবারও স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করবেন বলেও জানান তিনি।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অতিরিক্ত সহকারী কর কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আইনজীবীদের কর্মসূচির কারণে রাজস্ব আদায়ে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং কর আদায় বেড়েছে।
চিকিৎসকদের চেম্বারে যাওয়ার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, তদন্তে একজন চিকিৎসক তার আচরণের প্রশংসা করে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে ওই তদন্তে কিছু ব্যক্তি কর-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য, বিভাগীয় একাধিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং গত ৮ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত কর আদায়ে প্রায় ১২৫ থেকে ১৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নরসিংদী কর জোনের কর কমিশনার মো. মহিতুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



