পৌরসভায় বয়স্ক ভাতা নিতে গিয়ে দুই আঙুল বৃদ্ধ হারালেন
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম
জীবনের শেষ বয়সেও থামেনি সংগ্রাম। ৮৮ বছর বয়সে যখন বিশ্রামে থাকার কথা, তখনও স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে বসে সূক্ষ্ম কাজ করেন লোকনাথ ধর। সেই হাতই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু নরসিংদী পৌরসভায় বয়স্ক ভাতা তুলতে গিয়ে হারিয়েছেন বাম হাতের দুটি আঙুল। এখন ব্যথার সঙ্গে লড়াই করছেন, আর ভাবছেন এই হাত অচল হলে কীভাবে চলবে তার সংসার? কিভাবে বিয়ে দিবেন মেয়েকে?
জানা যায়, নরসিংদী শহরের বানিয়াছল এলাকার বাসিন্দা লোকনাথ ধর| পাঁচ মেয়ের জনক, ছেলে নেই। সারাজীবন স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে কাজ করে চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় মেয়ের বাড়িতে থেকে প্রতিদিন নরসিংদী বাজারে একটি স্বর্ণালংকারের দোকানে কাজ করেন। বয়সের ভার, চোখের ঝাপসা দৃষ্টি কিংবা শরীরের ক্লান্তি, কোনোটাই তাকে থামাতে পারেনি। কারণ, এখনও ছোট মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাকি, সংসারের খরচও চালাতে হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের বয়স্ক ভাতার তিন হাজার ৯০০ টাকা তার কাছে শুধু একটি ভাতা নয়, কয়েক মাসের ওষুধ, সংসারের বাজার আর ছোট মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য একটু সঞ্চয়ের আশা।
গত মঙ্গলবার ০৭ জুলাই) সেই ভাতার টাকা তুলতেই গিয়েছিলেন নরসিংদী পৌরসভায়। টাকা তোলার আগেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি নিয়ে।
ভূক্তভোগী ও তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে ভাতা অফিসের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আশ্রয় নেন লোকনাথ ধর। ঠিক তখনই বাইরে থাকা মানুষকে আটকে রাখতে ভিতর থেকে দরজাটি জোরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। দরজার ফাঁকে চাপা পড়ে যায় তার বাম হাতের দুটি আঙুল। মুহূর্তেই চারপাশ কেঁপে ওঠে তার আর্তচিৎকারে। লোকজন ছুটে এসে দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে অবশেষে দরজা খোলে। ততক্ষণে দুটি আঙুল প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলছিল। হাতে ধরা ভাতার কার্ড, পড়নের শার্ট, লুঙ্গিসহ পুরো শরীর রক্তে ভিজে যায়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্ত্যব্যরত চিকিৎসক ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করেন। সেখানে চিকিৎসকেরা আঙুল কেটে ফেলার কথা জানালে স্বজনদের আকুতি শুনে অস্ত্রোপচার করে রড বসিয়ে আঙুল দুটি বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে ডাক্তার জানিয়েছেন, আঙ্গুল দুটি বাঁচানোর সম্ভাবনা খুবই কম।
সরেজমিনে সোমবার (১৩ জুলাই) নরসিংদী শহরের বানিয়াছল মহল্লায় লোকনাথ ধর এর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে দিন কাটছে তার। ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। মাঝেমধ্যে আহত হাতটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। যে হাত দিয়ে সারাজীবন অন্যের গয়না তৈরি করেছেন, সেই হাত দিয়েই হয়তো আর আগের মতো কাজ করা হবে না। সবচেয়ে বড় ভয়, কাজ করতে না পারলে সংসার চলবে কীভাবে? ছোট মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন কি তবে অপূর্ণই থেকে যাবে? এখন এমন সব চিন্তা ঘুরে তার মাথায়। শেষ বয়সে তার চোখে এখন আর কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার আকুতি।
ভুক্তভোগীর স্ত্রী গীতা রাণী বণিক বলেন, ভাতার টাকা আনতে গিয়ে তিনি দুই আঙ্গুল হারিয়ে আসলেন। পৌরসভার একজন হাসপাতালে নিয়ে ফেলে রেখে চলে আসে। তিনি নিজেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে আসেন। এখন সারাদিন যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন। আমরা এখন সংসার চালানো নিয়ে শঙ্কায় আছি।
ভুক্তভোগীর নাতী সজল বণিক বলেন, আঙ্গুল দুইটা অকেজো হয়ে গেছে। ডাক্তার ফেলেই দিতে চেয়েছিলো। আমরা অনুরোধ করায় রড ডুকিয়ে অপারেশন করে দিয়েছে। কিন্তু এর কোন ভবিষ্যত নাই। আমাদের পরিবারের সামর্থ্য নেই ওনার চিকিৎসা করানোর। পৌরসভা ও সমাজ সেবা থেকে ১০ হাজার টাকা পেয়েছি। সরকারের সহযোগীতা পেলে আমরা দাদুর চিকিৎসা করাতে পারবো।
ভূক্তভোগী লোকনাথ ধর বলেন, বয়স্ক ভাতা আনতে গিয়ে আমার দুটি আঙ্গুল হারিয়েছি। এটা আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কারণ এখন আমার এ হাত দিয়ে অন্যের দোকানে স্বর্ণের গহনার কারিগর হিসেবে কাজ করে আমার সংসার চলে। সেই সাথে এক মেয়েকে বিয়ে দেয়া এখনো বাকী। কি করে সংসারই চালাবো আর কিভাবে মেয়েকে বিয়েই দিবো? এ নিয়েই চিন্তা করতে করতে রাতে আর ঘুম আসে না। আমি চাই সরকার আমার পাশে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেক, যেনো পরিবার নিয়ে চলতে পারি।
নরসিংদী শহর সমাজসেবা অফিসার মো. রেজাউল করিম জানান, ঘটনাটি শুনার পর ওনার বাড়িতে আমরা দেখতে যাই এবং আমাদের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক অনুদান প্রদান করি। পাশাপাশি সরকারিভাবেও আর্থিক অনুদানের জন্য ওনার পরিবারকে একটি লিখিত আবেদন দেয়ার জন্য বলেছি। আবেদন পেলে যত দ্রুত সম্ভব আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা থেকে প্রতিবন্ধী ভাতায়ও স্থানান্তর করা হবে।
নরসিংদী পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মোছা: নাদিরা আখতার বলেন, অনেক মানুষের চাপাচাপিতে অসাবধানতাবশত ওনার আঙ্গুলটি দরজায় চাপা পড়ে। তবে আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে ভুক্তভোগীকে এককালীন পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করেছি। তবে বয়স্ক ভাতাটা পৌর সভার না, আর এ ভাতাটা পৌর সভায় দেয়ারও কথা না, এটা উপজেলা পরিষদে দেয়ার কথা, যেহেতু পৌরসভায় বড় জায়গা রয়েছে, সে জন্য এখানে টাকাটা দেয়া হচ্ছে।



