কুড়িগ্রামের সেই ‘মানবিক ডিসি’ নুসরাত সুলতানা এখন যুগ্ম সচিব
শফিকুল ইসলাম বেবু, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ঘোড়ার গাড়ি, ভাঙা মোটরবাইক, আর চারদিকে ধু-ধু বালুচর—কোনো সিনেমার দৃশ্য নয় এটি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর যখন পুরো দেশ এক চরম টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন কুড়িগ্রামের দুর্গম চরে চরে এভাবেই একাই ছুটে বেড়িয়েছেন একজন মানুষ। তিনি কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং সদ্য পদোন্নতি পাওয়া যুগ্ম সচিব নুসরাত সুলতানা।
২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক হিসেবে কুড়িগ্রামে যোগদান করেছিলেন তিনি। এরপর প্রায় এক বছরের মাথায়, ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট তিনি বিদায় নেন। সম্প্রতি তিনি সরকারের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তার এই অর্জনে কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আনন্দ ও গর্বের বন্যা বইলেও, চরাঞ্চলের মানুষের মনের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে।বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এসি রুমের মায়া ত্যাগ করে চরের তপ্ত বালুতে
দারিদ্র্যের তালিকায় দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে অন্যতম শীর্ষে থাকা একটি জেলাকে ভালোবেসে ফেলা সহজ ছিল না। কিন্তু নুসরাত সুলতানা সেটি পেরেছিলেন। জেলা শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয়ের মোহ ত্যাগ করে তিনি কুড়িগ্রামের ১৬টি নদ-নদীর চরের মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নিতে ছুটে গেছেন। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো তপ্ত বালু মাড়িয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন চরের শেষ সীমানায়।
কুড়িগ্রাম জেলার চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, "সাবেক জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানার মূল স্বপ্নই ছিল কুড়িগ্রামকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা। কুড়িগ্রামে নদী বিচ্ছিন্ন সাড়ে ৮০০ বর্গকিলোমিটার ৪শতাধিক চরের মধ্যে প্রায় ২৫০টি চরে সাড় ৫ লাখ মানুষ বসবাস করে। তিনি দেখতেন চরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাল্যবিয়ের কারণে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বাড়ছিল, যা বর্তমানে জেলায় প্রায় ১ লাখ। তিনি বিশ্বাস করতেন, চরের মানুষের জীবনমান উন্নত না হলে কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য কমবে না।"
এই চিন্তা থেকে তিনি চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন অষ্টমীর চর, নাগেশ্বরীর দুর্গম নারায়ণপুর এবং তিস্তা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন বিদ্যানন্দসহ বহু চরে গিয়ে মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলেন। চরের মানুষের কষ্ট দূর করতে তিনি দেশের ইতিহাসে পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মত প্রথমবারের মতো "চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়" গঠনের ঐতিহাসিক দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরেছিলেন—যা দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।
কুড়িগ্রামের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা
নুসরাত সুলতানা শুধু চরেই ঘোরেননি, জেলার অর্থনৈতিক চাকা সচল করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর নেওয়া প্রধান পরিকল্পনা ও উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ডিসি পার্ক নির্মাণ: ধরলা নদীর পাড়ে ৩০ কোটি টাকার বালু ভরাট এবং সরকারের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ এনে স্বপ্নের "ডিসি পার্ক" নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: সোনাহাট স্থলবন্দর থেকে ভূরুঙ্গামারী-নাগেশ্বরী-কুড়িগ্রাম-চিলমারী-গাইবান্ধা হয়ে ঢাকা পর্যন্ত সরাসরি রেললাইনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ।
অর্থনৈতিক জোন ও নৌপথ: কুড়িগ্রাম সদরের ধরলা ব্রিজ সংলগ্ন ভুটানিজ অর্থনৈতিক জোন দ্রুত চালুকরণ এবং সোনাহাট স্থলবন্দর আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি নৌপথের উন্নয়নে ধরলা নদী ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেন।
নারীদের স্বাবলম্বী ও যুবকদের কর্মসংস্থান: চরের নারীদের স্বাবলম্বী করা, উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণ এবং চরের যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
কেন অকালে বদলি হতে হয়েছিল?
স্থানীয় সূত্র জানায়, কুড়িগ্রামে নুসরাত সুলতানার এই গতিশীল কর্মযজ্ঞ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি এক অদৃশ্য প্রশাসনিক টানাপোড়েনের কারণে।
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, জেলা প্রশাসকের কিছু সাহসী কর্মকাণ্ডে এনজিও সংশ্লিষ্ট নেতার সাথে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের (যিনি একজন বিশিষ্ট এনজিও ব্যক্তিত্ব) সাথে বনিবনা না হওয়ায় এক বছরের মাথাতেই কুড়িগ্রাম থেকে তাঁকে বদলি করা হয়েছিল।
তবে জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, "জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানা একজন সম্পূর্ণ নিরহংকারী ও মানবিক মানুষ ছিলেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার ব্রত। তার বিদায়ের পরও কুড়িগ্রামবাসী তাঁকে ভোলেনি।"
দূর সাগরের পাড়ে, তবু মন চরে
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হয়ে দূর সাগরের পাড়ে চলে গেলেও কুড়িগ্রামের চরের মানুষ মনে করেন, এই মানবিক কর্মকর্তার মনের একটা বড় অংশ এখনো এই ধরলা-ব্রহ্মপুত্রের চরেই রয়ে গেছে। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের একটাই প্রার্থনা—"যেখানেই থাকুন প্রিয় মানবিক আপা, এই চরের অসহায় মানুষগুলোকে আর কুড়িগ্রামকে ভুলে যাবেন না।"



