প্রতিটি ভাঙনে হারাচ্ছে একটি স্বপ্ন, ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় শত শত পরিবার
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
একদিকে ভয়াল নরসুন্দা নদীর অব্যাহত ভাঙন, অন্যদিকে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষার মরিয়া চেষ্টা। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা বসতভিটা, আবাদি জমি ও জীবনের সঞ্চয় একের পর এক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি দিন শুরু হচ্ছে নতুন শঙ্কা নিয়ে—আজ আবার কার বাড়ি, কার জমি কিংবা কার স্বপ্ন নদীর গর্ভে হারিয়ে যাবে!
এমন চরম অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যেই দিন কাটছে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়নের বরুহা গ্রামের কয়েকশ পরিবারের। নদীভাঙন যেন এখানকার মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বর্ষা মৌসুম এলেই নতুন করে শুরু হয় আতঙ্ক, উদ্বেগ আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়নের বরুহা গ্রামের সওদাগরপাড়া থেকে রাজঘাট পর্যন্ত নরসুন্দা নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় তিন থেকে চারশ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে। একসময় শান্ত ও জনবহুল এই জনপদে মানুষের জীবন ছিল স্বাভাবিক। কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে নরসুন্দা নদীর ভয়াবহ ভাঙন তাদের সেই স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা, গ্রামীণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের এলাকা এবং বিভিন্ন স্থাপনা। নদীর ভাঙনে ইতোমধ্যে গ্রামের বহু পরিবার তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীতে পানি বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতের কারণে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও পাড় ধসে পড়ছে। নদীর পাড়ের মাটি ফেটে বড় বড় চিড় দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় রাতের অন্ধকারে হঠাৎ করেই কয়েক ফুট জায়গা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে নদীতীরবর্তী মানুষদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বরুহা গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড়ে বড় বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মাটির বিশাল অংশ ধসে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। নদীর একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা অনেক ঘরবাড়ি এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। কোনো কোনো বাড়ির উঠান, রান্নাঘর কিংবা গবাদিপশুর ঘর ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
অনেক পরিবার তাদের ঘরের টিন, কাঠ, দরজা-জানালা খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ পুরো বাড়ি ভেঙে অন্যত্র স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার অনেকেই অর্থাভাবে ঘর সরাতে পারছেন না। ফলে প্রতিদিন মৃত্যুভয় আর সর্বস্ব হারানোর আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করছেন তারা।
ভুক্তভোগীরা জানান, এখন তাদের দিন শুরু হয় নদীর পাড় পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখতে হয়, রাতে নতুন করে কতটুকু জায়গা ভেঙেছে। কার বাড়ি ঝুঁকিতে পড়েছে, কার জমি নদীতে চলে গেছে—এসব খবরই এখন গ্রামের মানুষের প্রধান আলোচনার বিষয়। অনেক পরিবার রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। নদীর গর্জন কিংবা মাটি ধসের শব্দ শুনলেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন আতঙ্কিত মানুষজন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, নদীভাঙনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিখাত। প্রতিবছর কয়েক একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যে জমিতে একসময় ধান, পাট, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল উৎপাদন হতো, আজ সেখানে বইছে নদীর স্রোত। ফলে কৃষকরা জমি হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে দিনমজুরি কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
এলাকার নারী ও শিশুদের দুর্ভোগও কম নয়। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার বারবার বসতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে শিশুদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে। অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন অনেক নারী। ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনে নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ কিংবা নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে নদীতীর সংরক্ষণের কাজ শুরু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যেসব পরিবার ইতোমধ্যে ভিটেমাটি হারিয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আগামী বর্ষা মৌসুমে বরুহা গ্রামের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, নদীভাঙনের কারণে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। প্রতিদিনই নদী একটু একটু করে আমাদের বসতভিটা গিলে খাচ্ছে। কখন যে ঘরবাড়ি নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে, সেই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, এই বাড়িতেই আমাদের জন্ম, এই বাড়িতেই সংসার গড়েছি। এখন নদীভাঙনের কারণে সবকিছু হারানোর শঙ্কায় আছি। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে। প্রতিদিন মনে হয়, আজ না কাল আমাদের বাড়িটাও নদীতে চলে যাবে।
কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, আমার কয়েক একর কৃষিজমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। সেই জমির ফসল বিক্রি করেই পরিবার চলত। এখন জমি নেই, আয় নেই। বাধ্য হয়ে দিনমজুরের কাজ করছি। এভাবে চলতে থাকলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।
স্থানীয় যুবক সোহেল মিয়া বলেন, বর্ষা এলেই আমাদের ভয় বেড়ে যায়। রাতের বেলা নদীর পাড় ধসে পড়ার শব্দ শুনে ঘর থেকে বের হয়ে আসতে হয়। কখন কার বাড়ি ভেঙে যায়, কেউ বলতে পারে না। দ্রুত ব্লক ফেলে নদীতীর রক্ষা করা না হলে পুরো এলাকা হুমকির মুখে পড়বে।
প্রবীণ বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে এই নদী দেখছি, কিন্তু আগে কখনো এত ভয়াবহ ভাঙন দেখিনি। গত কয়েক বছরে নদীর স্রোত ও গতিপথ বদলে যাওয়ায় ভাঙন অনেক বেড়ে গেছে। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এত ক্ষতি হতো না।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, নদীভাঙনের প্রভাব শুধু ঘরবাড়ি বা জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক শিক্ষার্থী পরিবারসহ অন্যত্র চলে যাচ্ছে, ফলে তাদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবেও পুরো এলাকাটি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে তাড়াইল উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন ভূইয়া আসাদ বলেন, নরসুন্দা নদীর এ অংশে প্রায় ১৫ বছর ধরে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙতে ভাঙতে এখন তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এর আগে নদীর অপর পাড়ে তৎকালীন এমপি তনু সাহেবের উদ্যোগে প্রায় ৫ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে ব্লক ফেলা হয়েছিল, ফলে সেখানে ভাঙন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু বরুহা এলাকার এই অংশটি দিগদাইড় ও দামিহা ইউনিয়নের আওতাভুক্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে এমন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। নদীভাঙন রোধে দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগই একমাত্র সমাধান।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া যাবে। নির্দেশনা পাওয়ার পর দ্রুত ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে আশ্বাসে আর ভরসা পাচ্ছেন না নদীতীরের মানুষ। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে তারা ক্লান্ত। এখন তাদের একটাই দাবি—দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নদীভাঙন রোধ করা হোক। কারণ প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। নরসুন্দা নদীর করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে সরকারি সহায়তা ও টেকসই সমাধানের অপেক্ষায় দিন গুনছেন বরুহা গ্রামের শত শত পরিবার।



