ধর্ষণের মামলা করেই বিপাকে পরিবার, হুমকিতে ঘরছাড়া মা ও দুই শিশু সন্তান
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
মেয়ের সম্ভ্রমহানির বিচার চেয়ে থানায় মামলা করেছিলেন এক অসহায় মা। তার বিশ্বাস ছিল, আইনের আশ্রয় নিলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হবে এবং তার মেয়ে ন্যায়বিচার পাবে। কিন্তু সেই সাহসী সিদ্ধান্তই এখন তাদের পরিবারের জন্য চরম দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্ষণের মামলা দায়েরের পর থেকেই আসামিপক্ষের একের পর এক প্রাণনাশের হুমকি, ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পুরো পরিবার এখন বাড়িছাড়া। বাধ্য হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন শিশুটির মা। এতে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা। একইসঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুই শিশুর লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের আখড়াবাজার এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন ভুক্তভোগী শিশুটির মা। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, মামলা করার পর থেকেই তাদের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী জানায়, তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ভাবুন্দিয়া গ্রামে। দরিদ্র পরিবারটির একমাত্র উপার্জনের ভরসা দিনমজুর স্বামী। অভাব-অনটনের মধ্যেও দুই মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছিলেন তারা। বড় মেয়ে সাড়ে সাত বছর বয়সী এবং স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ের বয়স পাঁচ বছর, সেও একই বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, গত ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রতিবেশী সৌদি প্রবাসী লিটন মিয়ার ছেলে সানিম (১৫) সেন্টার ফ্রুট চকলেট দেওয়ার কথা বলে তার বড় মেয়েকে বাড়ির পাশে ডেকে নিয়ে যায়। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর শিশুটি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে পরিবারকে বিষয়টি জানায়।
পরদিনই ভুক্তভোগীর মা কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। পরে পুলিশ অভিযুক্ত সানিমকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে বিচারক তাকে গাজীপুর কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে আসামি গ্রেপ্তারের পরও থামেনি ভুক্তভোগী পরিবারের দুর্ভোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, আসামির বাবা (বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থানরত) এবং তার পরিবারের সদস্যরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। না তুললে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন ভুক্তভোগীর মা।
এছাড়া আসামির কয়েকজন আত্মীয় বাড়িতে গিয়ে একাধিকবার ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে পরিবারটি নিজ বাড়ি ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার কানিকাটা এলাকায় আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেয়। বর্তমানে দুই শিশুর স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপের কারণে তাদের লেখাপড়া বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক সংকটও আরও তীব্র হয়েছে।
ভুক্তভোগীর মা বলেন, “আমার মেয়ের জীবনের সর্বনাশ হয়েছে। এখন বিচার চাইতে এসে আমরা নিজেরাই ঘরছাড়া। আমরা কোথাও নিরাপদ নই। তিনি প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ও আসামিদের হুমকি থেকে সুরক্ষা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঁইয়া বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।



