নরসিংদী জনস্বাস্থ্যে ‘তথ্যের তালা' কোটি টাকার প্রকল্পে প্রশ্নের পাহাড়
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
সরকারি দপ্তরের তথ্য জনগণের সম্পদ। সেই তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে দেশে রয়েছে তথ্য অধিকার আইন। কিন্তু নরসিংদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চলছে ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে সরকারি প্রকল্পের তথ্য জানতে চাইলে নাকি প্রয়োজন স্থানীয় এমপিদের অনুমতি। এমন অভিযোগ উঠেছে নরসিংদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেনের বিরুদ্ধে। শুধু তথ্য গোপনই নয়, তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, অসমাপ্ত কাজের বিল পরিশোধ, নলকূপ বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি এবং মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অসঙ্গতির অভিযোগও ঘুরপাক খাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন প্রায় তিন বছরেরও অধিক সময় ধরে নরসিংদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। গত সরকারের আমলে তিনি বেশ দাপটের সঙ্গে নরসিংদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের কার্যক্রম করেছেন। এখন অবশ্য আগের সেই দাপুটে ভাব খুব একটা নেই। বাহ্যিক আচরণ এবং চলনে-বলনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বলা যায় অনেকটাই ভদ্র এবং ম্লান। চলনে-বলনে বিষন্ন বিষন্ন ভাব। তবে এ বিষন্নতার মধ্য দিয়েও তিনি তার দাপ্তরিক কাজে সরকারি বড় বড় প্রকল্পের পুকুর চুরি করে যাচ্ছে। যে চুরির হিসেব পত্রের কোনো সীমা রেখাও খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এমনকি নরসিংদীর গণমাধ্যম কর্মীরা তার কাছে তথ্য অধিকার আইনে নির্ধারিত ফর্মে এবং হাতে লেখা দরখাস্তের মাধ্যমে তথ্য চেয়েও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। সাংবাদিকদের কোনো ফোন কলও (অবশ্য দু’একজন ব্যতীত) তিনি রিসিভ করেন না। সাংবাদিকরা স্বশরীরে গিয়ে তার কাছে তথ্য চাইলে বা বিভিন্ন অর্থ বছরের মাঠ পর্যায়ে কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি সেই তথ্যও দিতে রাজি হয়নি। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে তথ্য জানতে চাইলে তিনি স্থানীয় এমপিদের অনুমতির প্রসঙ্গ টেনে আনেন। প্রকৌশলী জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কোনো তথ্য জানতে চাইলে স্থানীয় এমপিদের অনুমতি লাগবে। প্রশ্ন উঠেছে একটি সরকারি দপ্তরের তথ্য কি জনপ্রতিনিধির অনুমতির ওপর নির্ভরশীল? নাকি এটি তথ্য গোপনের নতুন কৌশল?
সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রকল্পের তথ্য জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখার সুযোগ কতটুকু, এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য অধিকার আইন সরকারি দপ্তরগুলোকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই প্রণীত হয়েছে। সেখানে তথ্যের পরিবর্তে অনুমতির শর্ত আরোপ আইনটির মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জানা গেছে, এই প্রকৌশলী রেজওয়ানের হোম ডিস্ট্রিক্ট পাবনায়। দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতির এলাকার বাসিন্দা তিনি। গত সরকারের আমল থেকে টানা প্রায় তিন বছরেরও অধিক সময় তিনি রাষ্ট্রপতির এলাকার কর্মকর্তা হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নরসিংদীতে ধরাকে সরা জ্ঞান করার মতো কাজ করে চলছেন। নরসিংদীর কারো কাছে তার কোনো জবাবদিহী করতে হয় না। তিনি অনেকটাই ডেম ক্যায়ারের মতো। তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে বহু অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পের টাকা হরিলুটের। মিথ্যা বিল ভাউচারের মাধ্যমেও হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। এমনও অভিযোগ উঠছে, মাঠ পর্যায়ে ঠিকাদারের সংগে কন্ডিশন করে কাজ না করিয়েই ঠিকাদারকে বিল উঠিয়ে দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনস্বার্থে সাধারণ দরিদ্র পরিবারে নলকুপ এবং গভীর নলকুপ সরকারের নির্ধারিত ফি এর মাধ্যমে স্থাপন করা হয়ে থাকে। সে কাজগুলো করে থাকে প্রত্যেক উপজেলা ভিত্তিক জনস্বাস্থ্য অফিস এবং এর মূল নিয়ন্ত্রণ করে নরসিংদী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী। প্রকৌশলীর সেই নির্বাহী ক্ষমতাবলে টানা প্রায় তিন বছর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসেবের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি অনেকের বাড়িতে নলকুপ স্থাপনের কথা বলে সরকারি নির্ধারিত ফি এর চেয়েও বেশি টাকা নেয়ার পরও নলকুপ স্থাপনের শতভাগ কাজ সম্পন্ন করে নাই। এক বাড়িতে প্রায় দেড় বছর আগে নলকুপের শুধু পাইপ স্থাপন করে আসছে জনস্বাস্থ্যের ঠিকাদারের লোকজন। কিন্তু অবশিষ্ট কাজ আজও পর্যন্ত করে নাই। এরকম শত শত অনিয়মের মধ্যে চলছে নরসিংদী জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এমনও অভিযোগ উঠছে, বিভিন্ন নামে বেনামে মাঠ পর্যায়ে নলকুপ বরাদ্ধ দেয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো মিল খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি দপ্তরের নলকুপ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ফ্যামিলিতে দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পৌর শহরের অনেক ভিত্তশালীদের বাসাবাড়িতেও দেয়া হয়েছে। আবার দেখা গেছে অনেক জনপ্রতিনিধির সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন জনকে নলকুপ বরাদ্ধের হিসেবপত্র কাগজপত্রে দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো হদিস খোঁজে পাওয়া যায় না।
রায়পুরার ডৌকারচর ইউনিয়নের তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক রুমান মিয়া জানান, প্রায় দেড় বছর আগে তাদের বাড়িতে একটি নলকুপের শুধু পাইপ স্থাপন করে চলে গেছে। অবশিষ্ট কাজ এখনো পর্যন্ত করেনি। সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করলে তারা জানায় ‘আপনার নামের তালিকা খোঁজে পাচ্ছি না’।
নরসিংদী প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ মোবারক হোসেন বলেন, প্রায় নয় মাস পূর্বে নির্ধাতির তথ্য অধিকার ফর্মে তথ্য চেয়ে আবেদন করি। পরে তথ্য নেয়ার জন্য প্রকৌশলীর সাথে বার বার যোগাযোগ করলেও তিনি নানা তালবাহানা করতে থাকে। এক পর্যায়ে প্রকৌশলী জানান, কোনো তথ্য নিতে হলে ঠিকাদারদের অনুমতি লাগবে। ঠিকাদারদের অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য দেয়া যাবে না। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না দেয়ায় পূনরায় আপীল আবেদন করি। তারপরও কোনো তথ্য দেননি। পরে নির্ধারিত ফর্মে প্রধান তথ্য কমিশনার বরাবর অভিযোগ দায়ের করি। এছাড়াও এই প্রকৌশলী তার বন্ধুর একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে নানা কৌশলে কাজ দিচ্ছে এবং দুই বন্ধু মিলে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
নরসিংদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন বলেন, কোনো তথ্য নিতে হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলার এমপিদের অনুমতি লাগবে। তথ্য অধিকার ফর্মে না যেভাবেই আবেদন করেন না কেন, এমপি সাহেবদের অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য দেয়া যাবে না।
এব্যাপারে নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, “আমি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে সাংবাদিকদের তথ্য দিতে নিষেধ করিনি। বরং নিয়ম অনুযায়ী তথ্য দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রত্যেক কর্মকর্তা বাধ্য। কারণ সরকারি প্রত্যেকটা প্রজেক্টে কি কাজ হচ্ছে না হচ্ছে, কি যাচ্ছে, কি ব্যবহার হচ্ছে এবং তা মানসম্মত কি না, বা নিয়ম মাফিক হচ্ছে কিনা তা প্রত্যেক সাংবাদিকের জানা উচিৎ এবং জানার অধিকার রাখে। আর এটাই হচ্ছে তারেক জিয়ার রাজনীতি। নেই কোনো ভয়ভিতি, থাকবেনা কোনো দান্ধাবাজি-দুর্নীতি।”



