নরসিংদীতে অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর ন্যাশনাল রিপোর্ট বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম
দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর ন্যাশনাল রিপোর্ট উপস্থাপন উপলক্ষে নরসিংদীতে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে নরসিংদী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল কাশেম মোহাম্মদ ফজলুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নরসিংদী জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। এছাড়া জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক রেজওয়ানা কবীরসহ জেলা প্রশাসন, পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সেমিনারে জানানো হয়, একটি দেশের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বেঞ্চমার্ক পরিসংখ্যানের প্রধান উৎস হলো অর্থনৈতিক শুমারি। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, সুযোগ-সুবিধা ও সেবার অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিল্পনীতি প্রণয়ন এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) নিরূপণসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক নির্ধারণ সহজ হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সময়ের বিবর্তনে দেশের কৃষি বহির্ভূত অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রস্তুত, এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২৪ সালে দেশের চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারি পরিচালনা করে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এ শুমারিতে সিএপিআই (Computer Assisted Personal Interviewing) ও জিআইএস (GIS) ম্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর আগে দেশে প্রথম অর্থনৈতিক শুমারি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। পরবর্তীতে ২০০১ ও ২০০৩ সালে দুই ধাপে দ্বিতীয় এবং ২০১৩ সালে তৃতীয় অর্থনৈতিক শুমারি সম্পন্ন হয়।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি, যা ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। অর্থাৎ গত এক দশকে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৪৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নরসিংদী জেলার ক্ষেত্রে এ প্রবৃদ্ধি আরও উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের শুমারিতে জেলায় মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা পাওয়া গেছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৩২৮টি। এর মধ্যে স্থায়ী ইউনিট ৯৯ হাজার ৫৩৪টি, অস্থায়ী ইউনিট ৯ হাজার ৯৩৫টি এবং অর্থনৈতিক খানা ৭০ হাজার ৮৫৯টি। ২০১৩ সালে জেলার অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ১৫২টি। ফলে গত এক দশকে নরসিংদীতে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির হার প্রায় ৬৮ দশমিক ১৯ শতাংশ।
সেমিনারে আরও জানানো হয়, জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে বর্তমানে মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন কর্মরত রয়েছেন, যা ২০১৩ সালের তুলনায় ২৫ দশমিক ০৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা ২ কোটি ৫৫ লাখ ১১ হাজার ৬৫২ জন (৮৩.২৮ শতাংশ), নারী কর্মী ৫১ লাখ ১৯ হাজার ২৭১ জন (১৬.৭১ শতাংশ) এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর কর্মী রয়েছেন ১ হাজার ৭৩৮ জন।
নরসিংদী জেলার অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে বর্তমানে মোট ৫ লাখ ২৯ হাজার ৮৭১ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে স্থায়ী কর্মী ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮৯৫ জন, অস্থায়ী কর্মী ১২ হাজার ৫৯৮ জন এবং অর্থনৈতিক খানাভুক্ত কর্মী ৮৮ হাজার ৩৭৮ জন। এছাড়া জেলার শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ৬ হাজার ২৭৮ জন পুরুষ এবং ১৯ হাজার ৬৭৪ জন নারী কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ অনুযায়ী নরসিংদী জেলার শিল্প কাঠামো সম্পর্কেও তথ্য তুলে ধরা হয়। জেলার শিল্প খাতে রয়েছে ১৪১টি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ৬৮২টি মাঝারি শিল্প, ১০ হাজার ২৬৫টি ক্ষুদ্র শিল্প, ১ লাখ ৩ হাজার ৪৪৮টি মাইক্রো শিল্প এবং ৬৫ হাজার ৭৯২টি কুটির শিল্প।
শুমারির ফলাফলে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের আধিপত্য আরও সুদৃঢ় হয়েছে। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯০ দশমিক ০২ শতাংশই সেবা খাতভুক্ত, যেখানে শিল্প খাতের অংশীদারিত্ব ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান মেরামত খাত ৪১ দশমিক ৮২ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
সেমিনারে জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক রেজওয়ানা কবীর বলেন, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একটি নির্ভুল ও হালনাগাদ ডাটাবেজ তৈরির লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে স্ট্যাটিস্টিক্যাল বিজনেস রেজিস্টার (এসবিআর) জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, এন্টারপ্রাইজ ও এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যকার ‘প্যারেন্ট-চাইল্ড রিলেশনশিপ’ চিহ্নিতকরণ এবং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বক্তারা বলেন, অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্য দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।



