Logo
Logo
×

সারাদেশ

নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন

পানির ন্যায্য হিস্যা না পেতে নিজস্ব সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ১২:৩১ পিএম

পানির ন্যায্য হিস্যা না পেতে নিজস্ব সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ

ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কোনো সমাধান না হওয়ায় নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল গ্রহণ করছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসায় খরা, বন্যা ও লবণাক্ততার মতো সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চীনের সহযোগিতায় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে ঢাকা।

এ লক্ষ্যে সরকার ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ এবং সংশোধিত তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট ও লবণাক্ততা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, চীন-অর্থায়িত তিস্তা মেগা প্রকল্পের লক্ষ্য নদীভাঙন রোধ, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং কৃষিজমি সুরক্ষা।

নদী গবেষকদের মতে, ভারতের উজানে নির্মিত বিভিন্ন বাঁধ, বিশেষ করে প্রায় ৫০ বছর আগে চালু হওয়া ফারাক্কা ব্যারাজ, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং কিছু এলাকায় মরুকরণের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। একই সময়ে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।

ঢাকার রিভার্স অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে অন্তত ৭৯টি নদী শুকিয়ে গেছে বা শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। উজানে পানি প্রত্যাহার ও পলি জমার কারণে শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীর অনেকগুলো আংশিক বা পুরোপুরি প্রবাহ হারাচ্ছে, যা কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মা নদীতে গড় প্রবাহ ছিল প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক। পরবর্তীতে তা অনেক সময় ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার কিউসেকে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছে। ২০১১ সালে তিস্তার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়নের আলোচনা চললেও বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির উল্লেখ করেছেন, তিস্তা ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়েছে এবং ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক কোনো অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের জনগণকে বহন করতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সম্পৃক্ততার আলোচনা থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এর সিনিয়র ফেলো উত্তম কুমার সিনহা মনে করেন, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই বাংলাদেশ বিকল্প অংশীদারের দিকে ঝুঁকছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য সংবেদনশীল। এটি শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান স্থলপথ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ উল্লেখ করেছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না। তার মতে, তিস্তা প্রকল্পকে নিরাপত্তা ইস্যুর বদলে উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।

তবে পরিবেশবাদীদের একাংশ পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এটি দেশের বদ্বীপভিত্তিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিও দুর্বল করতে পারে।

মো. খালেকুজ্জামান উল্লেখ করেছেন, কোনো ব্যারাজ নিজে পানি তৈরি করতে পারে না। শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে কতটুকু পানি পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা ছাড়া পদ্মা ব্যারাজের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

এরই মধ্যে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়ে কলকাতায় দুই দেশের কারিগরি কমিটির চার দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠক শেষে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নতুন চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি না হয়ে বাস্তব পানিপ্রবাহ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি কাঠামোতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নদী কূটনীতিতে সক্রিয়তা বাড়ালেও উজান থেকে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা ছাড়া বাংলাদেশের নদী সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব হবে না।

সূত্র: নিক্কেই এশিয়া

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন