মন্ত্রীর পরিদর্শনের পরদিনই ঈদের সকালে রোগীর হাতে মেয়াদোত্তীর্ণ রুটি
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১২:৩৬ এএম
ডায়াবেটিস ও পাতলা পায়খানাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ২৬ নম্বর কেবিনে ভর্তি হন আছিয়া বেগম (৭০)। তবে ভর্তি হওয়ার একদিন পরই ঈদের দিন সকালে হাসপাতালের নাস্তায় তাকে মেয়াদোত্তীর্ণ রুটি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। হাসপাতালের রোগীদের খাবার সরবরাহ করে সিদ্দিকী এন্টারপ্রাইজ।
ভুক্তভোগী আছিয়া বেগম কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের লাউরা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি হাজী ফয়েজ উদ্দিনের স্ত্রী। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বুধবার দুপুরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা নাস্তার রুটির গায়ে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখতে পান তারা। বিষয়টি নজরে আসার পর তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দায়িত্বরতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরে রুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
রোগীর এক স্বজন বলেন, “একজন অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি থাকে সুস্থ হওয়ার আশায়। সেখানে যদি মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার দেওয়া হয়, তাহলে রোগীরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। এটা অত্যন্ত দায়িত্বহীনতার পরিচয়।”
হাসপাতালে ভর্তি থাকা আরও কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজন অভিযোগ করেন, হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরেই নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক সময় খাবারের মান এতটাই খারাপ থাকে যে রোগীরা তা খেতে পারেন না। তাদের দাবি, ঈদসহ বিশেষ দিনগুলোতেও রোগীদের জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
এদিকে, হাসপাতালের খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিদ্দিকী এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে আগেও খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করেন কয়েকজন স্বজন। তাদের অভিযোগ, রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। কেউ কেউ খাবার সরবরাহে অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ঘটনার একদিন আগেই বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালের খাবারের মানও পরিদর্শন করেন বলে জানা যায়।
তবে কয়েকজন রোগী ও স্বজনের দাবি, মন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সেদিন তুলনামূলক ভালো মানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ সময়ে রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়। তাদের ভাষ্য, “মন্ত্রীর সামনে একরকম, আর প্রতিদিন আরেকরকম অবস্থা।”
এর আগেও হাসপাতালের খাবার নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল বলে জানান কয়েকজন স্বজন। তারা বলেন, কিছুদিন আগে এক রোগীকে কাঁচা কলা দেওয়ার ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
রোগীর ছেলে হুমায়ুন আহমেদ বলেন, “আমার মাকে সুস্থ করার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু হাসপাতালে এসে যদি মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেতে হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? ঈদের দিনের মতো বিশেষ সময়েও রোগীদের এমন খাবার দেওয়া খুবই দুঃখজনক। আমরা চাই, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো রোগীকে এ ধরনের খাবার না দেওয়া হয়।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সরবরাহের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা বলছেন, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগীদের নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে সিদ্দিকী এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আতাহার আলী টুটুল বলেন, “কিছু দলীয় লোকজন ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আগের দিনও তারা মন্ত্রীর সামনে হাসপাতালের খাবার নিয়ে বদনাম করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মন্ত্রী নিজেই খাবার খেয়ে এর মান ভালো বলে মন্তব্য করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে ফোনে বক্তব্য দিয়ে লাভ নেই। সামনাসামনি কথা বলব।” পরে এ কথা বলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা অভিযোগ শুনেছি এবং সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। প্রাথমিকভাবে যারা খাবার সরবরাহের দায়িত্বে আছেন, তারা জানিয়েছেন এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছি।”
তিনি আরও বলেন, “রুটিটি ২৬ তারিখে তৈরি হয়ে ২৮ তারিখ পর্যন্ত মেয়াদ ছিল। অনেক সময় রোগীরা হাসপাতালের খাবার না খেয়ে বাইরে থেকে বা বাসা থেকে আনা খাবার খান। সেক্ষেত্রে হাসপাতালের দেওয়া রুটি বা খাবার কেবিনে পড়ে থাকতে পারে। পরে সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।”
আগের কাঁচা কলা বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যে কলা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল সেটি মূলত নেপালি কলা ছিল। সাগর কলা বেশি পেকে গেলে ভেতরের অংশ নরম হয়ে যায়। বিষয়টি কাঁচা কলা ছিল না।”
উপপরিচালক আরও বলেন, “আমরা সবসময় চেষ্টা করি রোগীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে। এখানে কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রোগীদের আরও ভালো ও মানসম্মত সেবা কীভাবে দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আমরা কাজ করছি।”



