যে ঘরে নতুন জামা নিয়ে ফেরার কথা ছিল, সেই ঘরেই ফিরছে দুটি নিথর দেহ
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ১০:৩৮ এএম
ঈদের আনন্দ যে কখনও কখনও কত নির্মম শোকে পরিণত হতে পারে, নরসিংদীর এই ঘটনাটি যেন তারই এক হৃদয়বিদারক প্রতিচ্ছবি। নতুন জামার ব্যাগ হাতে, সন্তানদের মুখে ঈদের হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে শহরে এসেছিলেন এক হতদরিদ্র বাবা-মা। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই দ্রুতগতির ট্রেন কেড়ে নিল মা ও শিশুপুত্রের জীবন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই নতুন জামা আর গায়ে তোলা হলো না। মুহূর্তেই উৎসবের রঙ বদলে গেল কান্না আর আহাজারিতে।
এই মৃত্যু শুধু মা ও সন্তানের নয়, এটি এক বাবার স্বপ্নের মৃত্যু, একটি পরিবারের ঈদের মৃত্যু, এবং সমাজের জন্য গভীর মানবিক বেদনার প্রতিচ্ছবি।
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঈদের আগের দিন রাতে নতুন জামা-কাপড় কিনে বাড়ি ফেরার পথে নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় মা ও ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (২৭ মে) রাতে নরসিংদী রেলস্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকার সুজন মিয়ার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) ও তাদের ১৮ মাস বয়সী ছেলে সাফওয়ান ওরফে হাসেন।
স্বজনরা জানায়, সুজন মিয়া দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। কখনো ইজিবাইক চালিয়ে, আবার কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করে সংসার চালান তিনি। ঈদ উপলক্ষে বুধবার বিকেলে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে নরসিংদী শহরে কেনাকাটা করতে আসেন। দুই সন্তানের জন্য নতুন জামা-কাপড় কেনার পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিল পরিবারটি। ফেরার পথে নরসিংদী রেলস্টেশনের প্লাটফর্ম অতিক্রম করার সময় দ্রুতগতির কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় সাথী বেগম ও তার শিশু সন্তান গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মা ও ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল ও এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবার, ভালোবাসা আর একসঙ্গে থাকার উৎসব। অথচ সেই ঈদের আগমুহূর্তেই সুজন মিয়ার পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। যে ঘরে নতুন জামা নিয়ে ফেরার কথা ছিল, সেই ঘরেই ফিরছে দুটি নিথর দেহ। একটি দরিদ্র পরিবারের সব স্বপ্ন, সব হাসি যেন থেমে গেল রেললাইনের পাশে।
আশ্রুসিক্ত কণ্ঠে নিহতের স্বামী সুজন মিয়া বলেন, আমার চোখের সামনে স্ত্রী আর অবুঝ সন্তানকে হারালাম। ট্রেন আসতে দেখে অনেক চিৎকার করেছি, আটকানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাঁচাতে পারিনি। এবার ঈদ আমি কী নিয়ে করব?
নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশের উপ পরিদর্শক দিলীপ চন্দ্র সরকার জানায়, স্টেশনের এক নম্বর লাইনে একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। এসময় কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস স্টেশন অতিক্রম করছিল। ওই পরিবারটি রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই মা ও ছেলের মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



