Logo
Logo
×

সারাদেশ

কোরবানির ঈদেও হতাশার দীর্ঘশ্বাস, কুড়িগ্রামের চরে নেই উৎসবের আমেজ

Icon

কুড়িগ্রাম প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

কোরবানির ঈদেও হতাশার দীর্ঘশ্বাস, কুড়িগ্রামের চরে নেই উৎসবের আমেজ

ঈদ মানেই আনন্দ, নতুন পোশাক আর কোরবানির মাংসের ঘ্রাণ। কিন্তু কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে সেই আনন্দ যেন বহু আগেই হারিয়ে গেছে নদীর স্রোতে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের চরজুড়ে এবারও অসংখ্য পরিবার ঈদ পার করবে অভাব, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোথাও কোরবানির পশু নেই, আবার অনেক ঘরে ঈদের দিন এক কেজি মাংসও জুটবে না।

নদীভাঙনে বারবার নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলোর কাছে ঈদ এখন অনেকটাই বিলাসিতা। সরকারি সহায়তা বলতে ঈদের আগে ১০ কেজি ভিজিএফের চাল ও স্বল্পমূল্যের টিসিবির কিছু পণ্য— এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ তাদের উৎসবের প্রস্তুতি।

সরেজমিনে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বুক জেগে ওঠা ‘মাঝের চর’-এ গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। চর থেকে যাত্রাপুর নৌকা ঘাটে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরে নদীভাঙনের শিকার অন্তত ৭০টি পরিবার নতুন করে বসতি গড়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও থামেনি তাদের জীবনসংগ্রাম।

চরের বাসিন্দা আরমান আলী ও আউলিয়া বেগম দম্পতি চার সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। আরমান আলী সিরাজগঞ্জের একটি তাঁত কারখানায় কাজ করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কাজের অনিয়মিত পরিস্থিতির কারণে এবার ঠিকমতো আয় করতে পারেননি। তাই সন্তানদের নতুন জামা তো দূরের কথা, ঈদের দিন এক কেজি মাংস কিনে খাওয়ানোর সামর্থও নেই তার।

আরমান আলী বলেন,

“তাঁতের কাজ বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। এবার ঠিকমতো কাজ হয়নি। হাতে টাকা নাই। ছেলে-মেয়েদের জামা কিনতে পারি নাই। মাংস কেনার টাকাও নাই। যদি ভাগ্যে থাকে, তাহলে হয়তো বাচ্চারা ঈদের দিন মাংস খেতে পারবে।”

একই চরের বাসিন্দা জেসমিন আক্তারের কণ্ঠেও হতাশা। তিনি বলেন,

“আমাদের চরে কোরবানি হয় না। ঈদের দিন বাচ্চাদের একটু মাংস খাওয়াতে পারলে ভালো লাগতো।”

মাইদুল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “এখানে সবাই গরিব মানুষ। কোরবানি দেওয়ার সামর্থ কারও নাই। কেউ যদি চরে এসে গরু কোরবানি করতো, তাহলে অনেক পরিবার মাংস খেতে পারতো।”

মাঝের চরের অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষিকাজ। বন্যার সময় ছাড়া চরের জমিতে ধান, কাউন, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে কোনোমতে সংসার চলে তাদের। কিন্তু উৎপাদন খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে সামান্য আয়। সেই আয়ে পুরো বছরের খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়ালেখা চালাতেই হিমশিম খেতে হয়।

স্থানীয়রা জানান, বসতি গড়ার পর গত তিন বছরেও এই চরে কেউ গরু কোরবানি দিতে পারেননি। গত বছর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু মাংস বিতরণ করেছিল। এবার যাদের সামান্য সামর্থ আছে, তারা হয়তো একটি ব্রয়লার মুরগি কিনেই কোরবানির মাংসের স্বাদ খুঁজবেন।

শুধু মাঝের চর নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা, দইখাওয়ার চরসহ জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ পরিবারের চিত্র প্রায় একই। নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতেই কেটে যায় তাদের প্রতিদিন।

জানা গেছে, কুড়িগ্রামের নয়টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ১৬টি নদ-নদী। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের অববাহিকার ৪৬৯টি চরে বসবাস করছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাহীন সংকটের পাশাপাশি প্রতিবছরের বন্যা ও নদীভাঙন তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।

কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “চরাঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদের চেয়ে বড় চিন্তা এখন বন্যা ও টিকে থাকার লড়াই। প্রতিবছর অনেক চরে কোরবানি হয় না। সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি তাদের আনন্দের অংশ হিসেবে চরবাসীর পাশে দাঁড়ান, তাহলে অসংখ্য পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন,

“ঈদ উপলক্ষে হতদরিদ্র মানুষের জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিসিবির পণ্যও স্বল্পমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে সমাজের বিত্তবানরা যদি চরাঞ্চলের মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।”

চরের মানুষ এখন ঈদের আনন্দ নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াইটাকেই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন। তবুও ছোট ছোট শিশুদের চোখে এখনও একটুখানি স্বপ্ন— ঈদের দিন যদি একটু মাংস জোটে!

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন