ধর্ষণ ঘটনা মীমাংসা চেষ্টার অভিযোগ, ক্ষোভে কিশোরীর গলায় ফাঁস
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
নরসিংদীতে ধর্ষণের অভিযোগকে ধামাচাপা দিতে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও পুলিশের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে। সেই সালিশে ধর্ষণের ঘটনা টাকার বিনিময়ে মীমাংসা’র প্রস্তাব দেওয়ায় অপমান ও ক্ষোভে সালিশ চলাকালে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এক কিশোরী। বর্তমানে সে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছে।
শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের সোনাতলা চকপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
গুরুতর অবস্থায় প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাশের শিবপুর উপজেলায় বিয়ে হয়েছিল ওই কিশোরীর। এদিকে একই এলাকার প্রাইভেটকার চালক নাইম দীর্ঘদিন ধরে তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে কিশোরীকে ফুসলিয়ে স্বামীর সংসার থেকে আলাদা করে এনে একাধিকবার ধর্ষণ করে সে। এ ঘটনা জানাজানি হলে ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার পরিবার নাইমকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। বিয়ের দাবি জানালে নানা টালবাহানা শুরু করে অভিযুক্ত নাইম। বিয়ে করতে অস্বীকার করলে কিশোরীর পরিবার আইনী সহযোগিতা নিতে চাইলে স্থানীয় বিএনপি নেতারা স্থানীয় ভাবে সালিশের মাধ্যমে মিমাংসা করে দিবে বলে জানায়। নীরিহ কিশোরির পরিবার উপায়ন্তর না পেয়ে সালিশিতে রাজি হয়। অভিযোগ উঠেছে, সালিশ বৈঠকে জেলা ও ইউনিয়ন বিএনপির একাধিক নেতা ছাড়াও একজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে সোনাতলা চকপাড়া এলাকায় জেলা বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক আউলাদ হোসেন মোল্লা, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল হক টিটু, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন খোকা, চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আমজাদ হোসেন, ইউনিয়ন যুবদল নেতা জাহাঙ্গীরসহ একাধিক নেতার উপস্থিতে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় সেখানে একজন পুলিশ সদস্যও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। সালিশ দরবারে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বিয়ের পরিবর্তে ৫০ হাজার টাকায় মিমাংসা করার প্রস্তাব উঠায়। এ খবর কিশোরি জেনে দরবার চলাকালেই ঘরের দরজা আটকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহতার চেষ্টা করে । এসময় পরিবারের লোকজন ঘটনা বুঝতে পেরে ঘরের দরজা ভেঙ্গে প্রবেশ করে তাকে উদ্ধার করে অজ্ঞান অবস্থায় নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন । সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিওতে ভর্তি করা হয়। সেখানে কিশোরী জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছে।
ভুক্তভোগীর মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার মেয়ের সংসার ভেঙে দিয়েছে নাইম। এক বছর ধরে বিয়ের কথা বলে আমার মেয়েকে সর্বনাশ করেছে। এখন বিচার চাইতে গেলে টাকার বিনিময়ে সব চাপা দিতে চায়। সেখানে ধর্ষণের বিচার বা বিয়ের নিশ্চয়তা না দিয়ে প্রথমে ২০ হাজার, পরে ৩০ হাজার এবং শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘটনা মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমরা বলি ৫০ হাজার না ১০ লাখ টাকা দিলেও নিব না, মেয়েকে ছেলের বিয়ে করতে হবে। টাকার বিনিময়ে মিমাংসার খবর শুনেই দরবার চলাকালে অপমান সইতে না পেরে ঘরে ঢুকে গলায় ফাঁস দিয়ে আমার মেয়ে মরতে গেছে। এখন সে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আমি থানায় আগেই লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম কিন্তু বিচার পাইনি। আমি এঘটনার দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি করছি।
অভিযুক্ত নাইম একই এলাকার শফিকুল ইসলামের ছেলে। সে পেশায় প্রাইভেটকার চালক।
জেলা বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আউলাদ হোসেন মোল্লা জানান, আমি অল্প সময়ের জন্য সালিশে গিয়েছিলাম ছেলে ও মেয়ের কথা শোনে জরুরি কাজ থাকায় পরে চলে আসি। পরে জানতে পেরেছি, দরবারে ১১ সদস্য বিশিষ্ট জোড়ি বোর্ড বসেছিল। সেখানে তারা সকলের কথা শোনে বিয়ে ও টাকার বিনিময়ে সমাধান দুই ধরনের মতামত ওঠে। এর মধ্যে ৮ জন বিয়ের পক্ষে ও তিন জন টাকা দিয়ে সমাধানের পক্ষে মতামত দেয়। এর মধ্যে কেউ টাকা দিয়ে সমাধানের বিষয়টি জানালে মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ধর্ষণের ঘটনা সালিশ যোগ্য কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি উভয়পক্ষের অনুরোধে গিয়েছিলাম। যেখানে এলাকার অনেক মানুষ ছিলো।
এদিকে সালিশে উপস্থিত থাকার অভিযোগ উঠেছে চিনিশপুর ইউনিয়নের বিট অফিসার এস আই মো: ইসহাক মিয়ার বিরুদ্ধে। মোবাইল ফোনে ঘটনার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, সালিশে আমি উপস্থিত ছিলাম না। সালিশে উপস্থিত ছিলেন এসআই ইউনুস। তবে সালিশে উপস্থিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এসআই ইউনুস। তিনি জানান, আমি ঘটনার খোঁজ খবর নিয়েছি। কিন্তু সালিশে ছিলাম না।
নরসিংদী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্ককর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. খায়রুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যায় ফাঁস নেওয়া এক কিশোরীকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়।
তবে নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম আর আল মামুনও দাবি করেছেন, সালিশে পুলিশের কেউ ছিল না এবং থানায় লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি। মেয়ের মা মৌখিক ভাবে অভিযোগ করেছেন তার মেয়ের সাথে নাইম একাধিকবার শারিরীক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে। এখন সে বিয়ে করতে টালবাহানা করছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সচেতনমহল বলছেন ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে সালিশ বসলো কীভাবে? আর সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি পুলিশের নামই বা কেন আসছে? তবে ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ সালিশযোগ্য কিনা এমন প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ধর্ষণের অভিযোগ টাকার বিনিময়ে মীমাংসার চেষ্টা শুধু বেআইনি নয়, এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অবমাননা।



