শেরপুরে গভীর রাতে কিশোরীকে উদ্ধার করে যুবকেরা, দায়িত্ব এড়ানোর অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাশে বগুড়ার শেরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা।বুধবার (২০ মে) দিবাগত গভীর রাত, চারপাশ প্রায় নিস্তব্ধ। এমন সময় রাস্তার পাশের একটি দোকানের বারান্দায় একা বসে থাকতে দেখা যায় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে। বিষয়টি দেখে স্থানীয় কয়েকজন যুবক মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে যান তার কাছে। পরে ওই কিশোরীর জীবনের করুণ বাস্তবতা শুনে তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে সহযোগিতা চান শেরপুর থানা পুলিশের কাছে। তবে সেখানে গিয়ে সহযোগিতার বদলে অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরীর নাম জান্নাতি খাতুন। তার ভাষ্যমতে, মা-বাবার বিচ্ছেদের পর বাবা ঢাকায় নতুন সংসার গড়েছেন। অন্যদিকে মাও অন্যত্র বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। ফলে কোথাও তার স্থায়ী আশ্রয় হয়নি। কখনো খালার বাড়ি, কখনো মামার বাড়িতে থাকলেও নানা অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে।
অসহায় অবস্থায় থাকা কিশোরীকে দেখে স্থানীয় যুবক জাফর, মুজাহিদ, তনু, সাব্বির ও সবুজসহ কয়েকজন তাকে নিয়ে যান শেরপুর থানায়। তাদের অভিযোগ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন মেয়েটিকে থানায় রাখতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করেন। এমনকি আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নিজেদের দায়িত্বে নিতে বলেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়েটিকে থানায় রাখা সম্ভব নয় জানিয়ে “না পারলে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান” বলেও মন্তব্য করা হয়।
এতে বিপাকে পড়ে যান মানবিক দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া ওই যুবকেরা। গভীর রাত পর্যন্ত তারা কিশোরীটিকে নিয়ে থানার চত্বরে অপেক্ষা করেন। পরে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমুকে মুঠোফোনে অবহিত করা হয়। এরপরও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি থানা পুলিশ—এমন অভিযোগ তাদের।
পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে কিশোরীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার স্বজনদের খোঁজ শুরু করেন স্থানীয় যুবকেরা। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর গভীর রাতে শাহবন্দেগী ইউনিয়নের দহপাড়া গ্রামে তার মামার বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। পরে মামা ও নানার সঙ্গে কথা বলে কিশোরীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে পুলিশের ভূমিকা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শেরপুর উপজেলা শাখার সভাপতি নিমাই ঘোষ বলেন, “বিপদে পড়লে মানুষ প্রথমেই থানার দ্বারস্থ হয়। সেখানে সহযোগিতার বদলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেলে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে মানবিক কাজে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।”
অভিযোগের বিষয়ে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, “মানবিকতা দেখাতে গিয়ে আমি তো আইনের বাইরে কাজ করতে পারি না। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা আছে, কোনো প্রতিবন্ধী বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে থানায় রাখা যাবে না। তাই আমরা তাদের আত্মীয়স্বজনের খোঁজ করার পরামর্শ দিয়েছি, অথবা নিজেদের হেফাজতে রাখতে বলেছি।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, “বিষয়টি জানতে পেরে আমিও মানবিক দিক বিবেচনায় থানা হেফাজতে রাখতে ওসিকে অনুরোধ করেছিলাম। তবে পরবর্তীতে মেয়েটিকে থানা হেফাজতে রাখা হয়নি বলে জানতে পেরেছি।”



