ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে প্রস্তুত ২৫১ রেলকোচ
নীলফামারী ও চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ঈদযাত্রায় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায় ট্রেনের যাত্রী। এই ধাক্কা সামলাতে ঈদুল আজহায় যাত্রীসেবার জন্য মেরামত করা হচ্ছে পুরোনো কোচগুলো। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কয়েকদিন পর নাড়ির টানে বাড়ি ফিরবে লাখো মানুষ। এই যাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ১২৭টি কোচ মেরামত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাহাড়তলী কারখানায় ১২৪টি মেরামত করা হচ্ছে। এতে ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৈয়দপুর কারখানা থেকে গত ঈদুল ফিতরে ১০৬টি কোচ রেলে যুক্ত করা হলেও এবার তা বাড়িয়ে ১২৭টি করা হচ্ছে। এগুলো ঈদের সময় যাত্রীদের আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার হবে। যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণের লক্ষ্যে কারখানায় এবার ১২৭টি কোচ মেরামতের কাজ চলছে। জনবল ও কাঁচামালের সংকট থাকলেও কারখানায় পুরোদমে চলছে কাজ। এসব কোচের বগি মেরামত ও রঙের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। ধোয়ামোছা করা হচ্ছে কোচের ভেতর ও বাইরের অংশ। একইসঙ্গে ওয়ার্কশপে ব্যস্ত সময় পার করছেন কর্মীরা। চলছে বগি মেরামত, যান্ত্রিক ত্রুটি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ। নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করছেন রেলকর্মীরা।
সৈয়দপুর কারখানার শ্রমিকরা জানিয়েছেন, কেউ করছেন ঝালাইয়ের কাজ, কেউবা ঘষে তুলছেন পুরোনো রঙ। আবার কেউ করছেন নতুন রঙ। এরপর তৈরি করা বগিগুলো ইঞ্জিনের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গন্তব্যে। এরই মধ্যে মেরামতের পর ৯৯টি কোচ চলে গেছে রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের কাছে। বাকি ২৮টি কোচ আগামী শনিবার হস্তান্তর করা হবে। সেগুলোর কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে।
এসব তথ্য বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘নীলফামারীর চিলাহাটি, পঞ্চগড়, রংপুর, লালমনিরহাট, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পথে যাত্রী পরিবহনে সক্ষমতা বাড়াতে এসব কোচ রেলওয়ের বহরে যুক্ত করা হবে। ঈদযাত্রায় বিশেষ ট্রেনগুলোতে এসব কোচ যুক্ত হলে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।’
শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে ৯৯টি কোচ ট্রাফিক বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ২৮টি কোচ আগামী শনিবার ট্রাফিক বিভাগে হস্তান্তর করা হবে।’
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতি বছর দুই ঈদের জন্য অধিকতর যাত্রীসেবার কথা ভেবে কোচ মেরামত করে থাকে। জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও এবার কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা দিনে-রাতে পরিশ্রম করে ঈদের জন্য ১২৭টি কোচ মেরামতের উদ্যোগ নেন। গত রোজার ঈদের চেয়ে আসন্ন ঈদে ২১টি বেশি মেরামত করা হচ্ছে।
কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, কারখানায় দুই হাজার ৮৫৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৬৪ জন শ্রমিক-কর্মচারী। বিভিন্ন শপে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে মেরামতের কাজ। অনেক শ্রমিক নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ২৩ শতাংশ জনবল নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করছেন তারা। ঈদযাত্রাকে গুরুত্ব দিয়ে পুরাতন কোচগুলোর জরাজীর্ণ কাঠামো পরিবর্তন, ট্রলি মেরামত, আসন বিন্যাস, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। এ কাজে বগি, হেভি রিপেয়ারিং, ক্যারেজ কনস্ট্রাকশন ও পেইন্ট শপসহ আরও ২৪টি শপ সহায়তা করছে।
কারখানার বিভিন্ন শপের কর্মচারীরা জানান, ঈদ আসলে তাদের কাজে ব্যস্ততা বাড়ে। এখন কাজের জন্য দম ফেলার ফুরসত নেই। ক্যারেজ শপে মেরামত হয়ে আসা কোচগুলো তারা রঙ করছেন। কেউবা ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছেন। আবার কেউ কোচের ভেতরে-বাইরে ধোয়ামোছার কাজ করছেন।
কারখানার শিডিউল শপের ইনচার্জ প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, ‘সৈয়দপুর কারখানায় দুই হাজার ৮৫৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৬৬৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারী। অর্থাৎ মাত্র ২৩ শতাংশ জনবল দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ রেলওয়ে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে ১২৭টি কোচ সচল করা হচ্ছে। যাত্রী চাপ মোকাবিলায় বাড়তি কোচ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করছি। পাশাপাশি এসব কোচ মেরামত করে ব্যবহার উপযোগী করছি।’
কারখানার ক্যারেজ শপের ইনচার্জ মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও মানুষের ঈদযাত্রা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের যাত্রীরা যেন নির্বিঘ্নে ঈদ করতে পারেন সেজন্য প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।’
বাড়তি যাত্রী চাপ সামলাতে ট্রেনের অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের লক্ষ্যে দিনরাত কাজ করছেন কারখানার শ্রমিকরা। রেলওয়ের পাহাড়তলী কারখানায় এবার অতিরিক্ত ১২৪টি বগি মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ৯৯টি বগি মেরামতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে অবশিষ্ট বগিগুলোর মেরামত শেষ করে পরিবহন দফতরের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারখানার সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহায় পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে পাহাড়তলী কারখানায় মাসখানেক আগে থেকেই অতিরিক্ত বগি মেরামতের কাজ শুরু করেছে রেলওয়ে। ৯৯টি কোচ মেরামত শেষে পরিবহন বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্টগুলোর মেরামত কাজ শেষ করে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগেই পরিবহন বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
শ্রমিকরা জানান, গত ঈদুল ফিতরে ১২৪টি কোচ মেরামত করা হয়েছিল। তবে রমজানের ঈদের তুলনায় কোরবানির ঈদে মানুষের বাড়ি ফেরার প্রবণতা বেশি থাকে। ফলে এবারও বাড়তি কোচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যাত্রীদের নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করতে আগেভাগেই কাজ শুরু করায় ঈদের ছুটির আগেই সব কোচের মেরামত সম্পন্ন হবে। এতে যাত্রীরা স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ জানায়, প্রতি বছর ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রী চাহিদার কথা বিবেচনা করে রেল কর্তৃপক্ষ প্রতিটি আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনে দুটি থেকে পাঁচটি পর্যন্ত অতিরিক্ত বগি যুক্ত করে থাকে। নিয়মিত ট্রেনে অতিরিক্ত বগি যুক্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে ‘ঈদ স্পেশাল’ ট্রেনও চালু করা হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের দুটি প্রধান কারখানার একটি পাহাড়তলী এবং অপরটি সৈয়দপুর। এই দুটি কারখানায় যথাক্রমে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের সব পুরোনো এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বগি মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়।
পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানার তত্ত্বাবধায়ক মোস্তফা জাকির হাসান বলেন, ‘ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ও যাত্রীদের চাপ সামলানোর জন্য পাহাড়তলী কারখানায় আমরা প্রায় দেড় মাস আগে থেকেই বগি মেরামতের কাজ শুরু করেছি। ১২৪টি বগি মেরামতের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ইতিমধ্যে ৯৯টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট বগিগুলোও দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেরামত করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর দুই ঈদেই ট্রেনে যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ থাকে। বিশেষ করে রোজার ঈদের তুলনায় কোরবানির ঈদে এই চাপ আরও বাড়ে। তাই যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি ট্রেনে চাহিদা অনুযায়ী আলাদা বগি সংযোজন করা হবে।’



