ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা ১১ বছরের শিশু, অভিযুক্ত সেই মাদ্রাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ১০:৫৩ এএম
আমান উল্লাহ সাগর
ধর্ষণে ১২ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বার ঘটনায় অভিযুক্ত নেত্রকোনার মদনে হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসা পরিচালক আমানউল্লাহ সাগরকে আটক করেছে র্যাব।
বুধবার (৬ মে) সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। আজ বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস এলাকায় এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হবে। এরপর আসামিকে নেত্রকোনা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মদন থানায় ভুক্তভোগীর মা আমান উল্লাহ সাগরকে অভিযুক্ত করে অভিযোগটি দায়ের করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর মদন উপজেলার পাঁচহার গ্রামে ২০২২ সালে হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একই মাদ্রাসাতে তার স্ত্রীও প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন। ভুক্তভোগীও একই এলাকার বাসিন্দা। মেয়েটির মাকে ছেড়ে গেছে তার বাবা। জীবিকার তাগিদে শিশুটির মা সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। ভুক্তভোগী শিশুটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর ওই মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের ভয় দেখান ওই মাদ্রাসা শিক্ষক। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে ওই শিক্ষক ছুটিতে যাওয়ার পর আর মাদ্রাসায় আসেননি বলে জানিয়েছেন আরেক শিক্ষক।
পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন দেখে সন্দেহ হয় পরিবারের। তখন তার মা সিলেট থেকে এসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে ঘটনা। শিশুটি মাদ্রাসার শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে জানায়। এরপর শিশুটিকে নিয়ে মদন উপজেলার বেসরকারি মেডিকেলে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তারকে দেখান। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, মেয়েটি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
এ বিষয়ে ডাক্তার সায়মা আক্তার জানান, বাচ্চাটি তার মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আসে এবং জানায় যে তার পেট সবসময় ভারী লাগে এবং পেটের ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে বলে মনে হয়। চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে দেখতে পান যে বাচ্চাটি প্রচণ্ড রক্তশূন্যতায় ভুগছে। তার শরীরে রক্ত নেই বললেই চলে।
এ দিকে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত সাগর তার স্বজন ও মাদ্রাসার অন্য একজন শিক্ষককে নিয়ে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। তারা দরিদ্র পরিবারটিকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে গত ১৮ এপ্রিল অভিযুক্ত সাগর তার স্ত্রী ও সন্তানসহ পালিয়ে যান। বর্তমানে মাদ্রাসাটি বন্ধ রয়েছে।
পরবর্তীতে গত ২৩ এপ্রিল ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর এবং মীমাংসাকারীকে আসামি করে মদন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর অন্য এক আসামি আদালতে হাজিরা দিয়ে জামিন নিয়ে তিনিও এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।
এ বিষয়ে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম সংগীয় ফোর্স নিয়ে ভুক্তভোগী শিশুটির বাড়িতে যান। তিনি পরিবারটিকে আইনি সহায়তা এবং নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। সেই সাথে কোনো ধরনের হুমকি-ধমকি দেয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই থানায় যোগদানের আগেই মামলাটি হয়েছে এবং মামলার দু-একদিন আগেই আসামি পালিয়েছে। আসামির পক্ষ থেকে মীমাংসার চেষ্টার বিষয়টি আমি শুনেছি। বর্তমানে এলাকায় একটি গুমট পরিস্থিতি বিরাজ করছে; কেউ তথ্য বা ফোন নাম্বার দিয়ে সহযোগিতা করতে চাইছে না। আসামির বাড়িতে তার মাকে পাওয়া গেলেও তিনি দাবি করেছেন যে তার ছেলে কোথায় আছে তা তিনি জানেন না। তবে আমরা যত দ্রুত সম্ভব আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’



