কিশোরগঞ্জে গবাদি পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও পরিবহন বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
দেশের চামড়া শিল্পের গুণগত মান রক্ষা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিশোরগঞ্জে ‘গৈবাদি পশুর চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানো, সংরক্ষণ ও পরিবহন’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ১০টায় জেলা শহরের স্টেশন রোড এলাকার হোটেল শেরাটনে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লেদার সেক্টর বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (এলএসবিপিসি) এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ) যৌথভাবে এই সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মাঠ পর্যায়ে চামড়া ছাড়ানো এবং প্রাথমিক সংরক্ষণে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। কর্মশালায় উপস্থিত স্থানীয় কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বৈজ্ঞানিক উপায়ে চামড়া ছাড়ানো, লবণ দিয়ে সংরক্ষণ এবং পরিবহনের সময় ঘর্ষণজনিত ক্ষতি এড়ানোর কৌশলগুলো হাতে-কলমে আলোচনা করা হয়।
বিএফএলএলএফইএ-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সারোয়ার লেদার কর্পোরেশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আলী আশরাফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এলএসবিপিসি উপ পরিচালক ইসরাত জাহান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বিএফএলএলএফইএ সিইও আশরাফ উদ্দিন আহমেদ খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এলএসবিপিসি সহকারী পরিচালক লিটন চন্দ্র রায়। টেকনিক্যাল অধিবেশন উপস্থাপন করেন ঢাকা আইলেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া কসাই হামিদ মিয়া বলেন, আমরা এতদিন বংশপরম্পরায় যেভাবে চামড়া ছাড়িয়ে এসেছি, আজ বুঝতে পারলাম তাতে অনেক ভুল ছিল। বিশেষ করে ধারালো ছুরির ভুল ব্যবহারের কারণে অনেক সময় চামড়া ফুটো হয়ে যায়। আজকের কর্মশালায় হাতে-কলমে আধুনিক পদ্ধতি দেখে আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।"কোরবানির সময় আমাদের ওপর অনেক চাপ থাকে, তাই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে চামড়ার ক্ষতি হয়। এখন থেকে আমরা পশুর গলার নিচে বা পায়ের অংশে কাটার সময় আরও সতর্ক থাকব যাতে চামড়ার মান ঠিক থাকে।
চামড়া ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, যদি কসাইরা চামড়াটা ভালোভাবে ছাড়িয়ে দেয়, তবে আমরাও বাজারে ভালো দাম পাই। মাঠ পর্যায়ে এই সচেতনতা যত বাড়বে, আমাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি তত কমবে এবং আমরা বিদেশে ভালো মানের চামড়া রপ্তানি করতে পারব। পরিবহনের সময় চামড়া একটার ওপর একটা স্তূপ করে রাখার ফলে ঘর্ষণে অনেক চামড়া নষ্ট হয়। আজকের কর্মশালা থেকে আমরা সঠিক পরিবহন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পেরেছি, যা আগামী কোরবানি ঈদে কাজে লাগাব।
আরেক ব্যবসায়ী মতি মিয়া বলেন, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের বড় দুশ্চিন্তা থাকে চামড়ার পচন নিয়ে। গরমে বা সঠিক সময়ে লবণ না দিলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আজকের আলোচনায় লবণের সঠিক পরিমাণ এবং চামড়া ভাঁজ করার কৌশলগুলো আমাদের জন্য খুব উপকারী হয়েছে।
বক্তারা চামড়া শিল্পের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। এলএসবিপিসি-এর সহকারী পরিচালক লিটন চন্দ্র রায় তার বক্তব্যে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন এবং এই শিল্পে সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত সহযোগিতার আহ্বান জানান।
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ খান বলেন, এ ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে আসন্ন কোরবানি মৌসুমে চামড়ার অপচয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। মানসম্মত চামড়া নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।
শেখ আলী আশরাফ বলেন, দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে কসাই, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দক্ষ করে তোলাই ছিল এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য। সঠিক উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইসরাত জাহান বলেন, সঠিক পদ্ধতির অভাবে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এটি কেবল ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা। সঠিক প্রশিক্ষণ এবং চামড়া ছাড়ানোর সময় সচেতন থাকলে এই অপচয় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।



