কিশোরগঞ্জে খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার ৭ নং সুতারপাড়া ইউনিয়নের উত্তর গণেশপুর খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম, স্বচ্ছতার অভাব ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের ৭ জন নির্বাচিত সদস্য একযোগে ইজারা বাতিল করে নতুন করে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইজারা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন তারা। অভিযোগকারীরা হলেন-ইউপি সদস্য জসিম, হারুন মিয়া, রোস্তম, মো. মোতালেব মিয়া এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য আলফিনা আক্তার, মুক্তা আক্তার ও মাহমুদা তাসলিমা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, উত্তর গণেশপুর খেয়াঘাটটির বর্তমান ইজারার মেয়াদ শেষ হবে ৩১ চৈত্র ১৪৩২। এর আগে প্রতি বছর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত প্রক্রিয়া ও সভার মাধ্যমে ইজারা প্রদান করা হলেও নতুন বাংলা সন ১৪৩৩-এর জন্য সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ইজারার মূল্য নিয়ে। গত বছর যেখানে ইজারার মূল্য ছিল ১৯ হাজার ৮০০ টাকা, সেখানে নতুন বছরে তা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৯০০ টাকা-অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে মাত্র ১০০ টাকা। একটি গুরুত্বপূর্ণ খেয়াঘাটের ক্ষেত্রে এমন নগণ্য টাকা ( মাত্র ১০০ টাকা) বৃদ্ধি অস্বাভাবিক এবং এতে সরকারের বিপুল রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, চেয়ারম্যান বরখাস্ত থাকায় বর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মালিক তানভীর হোসেন কোনো ধরনের সভা আহ্বান না করেই এবং অধিকাংশ সদস্যকে না জানিয়ে গত ১২ এপ্রিল ইজারা প্রদান করেন।
জানা যায়, গণেশপুর খেয়াঘাটে ইজারা প্রক্রিয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য রয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ করে একটি প্রভাবশালী মহল কম মূল্যে ঘাটটির ইজারা নিয়ে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, পেশায় পাটলী (খেয়া পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তি) না হলে ইজারা ডাকে অংশগ্রহণ করা যায় না। এই বিধিনিষেধকে কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালীরা নিজেদের লোকজন বা পেশাদার পাটলীদের মাধ্যমে ইজারা প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। ইজারা পাওয়ার পর প্রকৃত ইজারাদারকে নামমাত্র অর্থ প্রদান করে ঘাটটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় তারা। পরবর্তীতে ওই ঘাটটি আবার ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে অন্যদের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করা হয়। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, আর মধ্যস্বত্বভোগীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন এই খেয়াঘাট থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ফলে ঘাটটি ঘিরে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্বার্থ গড়ে উঠেছে, যা অনিয়মকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
সুতারপাড়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য মাহমুদা তাসলিমা বলেন, আমাদের কোনো সভায় ডাকা হয়নি, এমনকি বিষয়টি আগে জানানোও হয়নি। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত গোপনে নেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনিয়ম। কাগজে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য আমাকে ৭০ হাজার টাকা অফার করা হয়েছিল। কিন্তু আমি অনিয়মে জড়িত হতে রাজি হইনি।
আরেক সংরক্ষিত নারী সদস্য মুক্তা আক্তার বলেন, এই খেয়াঘাট থেকে আরও অনেক বেশি রাজস্ব আসার সুযোগ ছিল। কিন্তু স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কম টাকায় সুকৌশলে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকার এবং ইউনিয়ন পরিষদ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউপি সদস্য জসিম বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্তভাবে দরপত্র আহ্বান করলে আরও বেশি মূল্যে ইজারা দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু তা না করে তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সদস্য হারুন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ইজারা বাতিল করে পুনরায় নিলামের দাবি জানাই। কারণ এখানে স্পষ্টভাবে দুর্নীতি হয়েছে।
ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে আরও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মুমতাজ পাটনী। তিনি বলেন, আমি খেয়াঘাটটি ১০ লাখ টাকায় ইজারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেত। আমার সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও কৌশলে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, ফলে আমি নিলামে অংশ নিতে পারিনি। তিনি আরও বলেন, আমি এই ইজারা বাতিল করে সবার মতামতের ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় ইজারা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সুতারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মালিক তানভীর হোসেন বলেন, খেয়াঘাট ইজারার জন্য মোট পাঁচজন আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে একজন আবেদনকারী বাদ পড়েন। পরে নিয়ম মেনেই প্রকাশ্যে নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, এ বিষয়ে সব ইউপি সদস্যদের চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছিল। তবে কয়েকজন সদস্য চিঠি গ্রহণ করেননি। তাদেরকে শোকজ করা হবে।
এ বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে মুসলিমা বলেন, খেয়াঘাটের ইজারা নিয়ে কয়েকজন সদস্য লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে শুনানি শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



