পাকুন্দিয়ায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ‘অর্থ বাণিজ্যের’ অভিযোগে উত্তাল কলেজ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় একটি কলেজের অধ্যক্ষের একতরফা সিদ্ধান্ত, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং ফরম ফিলাপ নিয়ে ‘অর্থ বাণিজ্যের’ অভিযোগ তুলেছে শিক্ষার্থীদের একাংশ। এ ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস।
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপের সুযোগ না দেওয়া এবং পছন্দের শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিবাদে আজ কলেজের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
রবিবার (১২ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার পূর্ব নারান্দী ইউনিয়নের পোড়াবাড়ীয়া এলাকার মোহাম্মদ এম.এ. মান্নান মানিক কলেজ প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরাা।
এসময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদের পদত্যাগ এবং মানবিক বিবেচনায় সবার জন্য ফরম ফিলাপের সুযোগ দাবি করেন।
মানবিক বিভাগের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র সাব্বির হোসেন অভিযোগ করেন, নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও অধ্যক্ষ তাঁর পরিচিত বা আত্মীয় শিক্ষার্থীদের জন্য গোপনে বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। কলেজের চতুর্থ তলায় এই পরীক্ষা নেওয়া হয়, যার বিষয়ে সাধারণ ছাত্রদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
সাব্বির বলেন,"পছন্দের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হলেও সাধারণ ছাত্রদের কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হুট করে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি স্পষ্টতই বৈষম্য।"
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, যারা ৩-৪টি বিষয়ে ফেল করেছে, তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ফরম ফিলাপের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অথচ যারা মাত্র ১টি বিষয়ে সামান্য নম্বরের জন্য ফেল করেছে, তাদের কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ এবং কয়েকজন শিক্ষক মিলে এই 'ফরম ফিলাপ বাণিজ্য' চালাচ্ছেন।
আরেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাদিম আহমেদ জানান, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া এবং ঘনঘন শিক্ষক বদলির কারণে তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছিলেন। এর ওপর অন্য কলেজ থেকে প্রশ্নপত্র আনা এবং বাইরের শিক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করায় ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে।"নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যে মমত্ববোধ থাকে, বাইরের শিক্ষকদের কাছে তা পাওয়া যায়নি। ফলে অনেক ভালো ছাত্রও এক-দুই বিষয়ে ফেল করেছে। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে এইচএসসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে ঝরে পড়লে অনেকে মাদক বা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। অথচ অধ্যক্ষ কারোর মতামত তোয়াক্কা না করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন।"
শিক্ষার্থী লিজা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি মাত্র ৬ নম্বরের জন্য একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। অন্যান্য সব কলেজে এমন শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া হলেও এখানে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন,"এখনো হাতে সময় থাকা সত্ত্বেও স্যার আমাদের সুযোগ দিচ্ছেন না। আমাদের সব স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে।"আমাদের দাবি
অবিলম্বে বৈষম্য দূর করে সবাইকে সমান সুযোগে ফরম ফিলাপ করতে দিতে হবে। কলেজের নামে চলা অবৈধ 'অর্থ বাণিজ্য' বন্ধ করতে হবে। অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদকে পদত্যাগ করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা জানান, গত এক মাস ধরে তারা অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে এম.এ. মান্নান মানিক কলেজের অধ্যক্ষ মো. শরিফুল ইসলামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে এড়িয়ে যান। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাঠানো হলেও তিনি উপস্থিত হননি। একপর্যায়ে মুঠোফোনে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হলে তিনি বলেন, যারা অভিযোগ করছে, তারা কেবল নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়নি, বরং তার আগের প্রাক-নির্বাচনী (প্রি-টেস্ট) পরীক্ষাতেও অকৃতকার্য হয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতিও অত্যন্ত অনিয়মিত। প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্তৃপক্ষ হিসেবে আমাদের লক্ষ্য থাকে মেধার মূল্যায়ন এবং নিয়ম মেনে চলা। যারা বারবার পরীক্ষায় ফেল করেছে এবং ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল, তাদের মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া একাডেমিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা ফেল করার পর বিভিন্ন অভিযোগ করে থাকে, যা অমূলক। আমি নৈতিক অবস্থান থেকে আমার দায়িত্ব পালন করেছি৷
তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং দায়বদ্ধ। যে কেউ চাইলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড এবং পরীক্ষার ফলাফল সরাসরি এসে যাচাই করে দেখতে পারেন। আমরা নিয়ম বহির্ভূত কোনো কাজ করিনি।
ভালো ফলাফলের স্বার্থে প্রতিষ্ঠান যখন কঠোর নিয়ম মেনে চলে, তখন একদল শিক্ষার্থী এমন অভিযোগ করতেই পারে। তবে শিক্ষার মান বজায় রাখতে আমরা আমাদের নীতিতে অটল। আমি ব্যক্তিগতভাবে বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যেকোনো আলোচনা বা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আলহাজ্ব এম,এ, মান্নান মানিকের ফোনে একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি ফোনে সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রূপম দাসের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, প্রিন্সিপাল আমাকে জানিয়েছেন কিছু শিক্ষার্থী তাকে ঘিরে রেখেছে কারণ তাদের ফরম ফিলাপ করতে দেওয়া হচ্ছে না। পুরোনো বোর্ড পরীক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপ করতে বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নমনীয় হওয়া উচিত।



