৮ বছরেও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি ২৫০ শয্যার ভবনের, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষ
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
নরসিংদীতে ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে নির্মিত নতুন ভবনের কাজ দীর্ঘ ৮ বছরেও সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার বাসিন্দারা।
২০১৮ সালে প্রায় ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩ তলা ফাউন্ডেশনবিশিষ্ট ৮ তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বর্তমানে ভবনের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ। তবে এখনো রং করা, বেসিন ও বাথরুম ফিটিংস, লিফ্ট স্থাপনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এসব সরঞ্জাম এখনো স্থাপন করা হয়নি। ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেওয়ার তারিখ নির্ধারিত হলে এক মাসের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করা সম্ভব বলে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে ভবনের ৮ম তলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে। ইটের গাঁথুনি শেষ হয়ে প্লাস্টার, টাইলস ও দরজা স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। শ্রমিকরা আশা করছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই অংশের কাজ সম্পন্ন হবে।
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবনের বিভিন্ন তলায় জরুরি বিভাগ, আউটডোর, প্যাথলজি, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, সিসিইউ, প্রশাসনিক ব্লক, ওয়ার্ড এবং ডায়ালাইসিস ও আইসোলেশন ইউনিট স্থাপন করা হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এর ম্যানেজার কামাল উদ্দিন জানান, তাদের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ ২০২২ সালেই সম্পন্ন করে তারা হস্তান্তর করেছে। তবে পরবর্তীতে কিছু অতিরিক্ত কাজ নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে চলছে, যা মূল প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত নয়।
নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের নতুন ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন ২০১৮ সালে। ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বাজাটের এই কাজটি পায় এমএন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৩ তলা ফাউন্ডেশনের নির্মাণার্ধীন আটতলা ভবনের প্রথম তলায় থাকবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, রিসেপশন ও রান্নাঘর। দ্বিতীয় তলাজুড়ে থাকবে আউটডোরের ১৮ টি কক্ষ, তৃতীয় তলায় থাকবে রেডিওডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি। চতুর্থ তলায় অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও সিসিইউ। পঞ্চম তলায় স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগ এবং ২৮ শয্যা মহিলা ওয়ার্ড। ষষ্ঠ তলায় প্রশাসনিক অফিস (এ্যাডমিন ব্লক) ও ক্যান্টিন। সপ্তম তলায় থাকবে ৫৮টি ওয়ার্ড। এছাড়াও অষ্টম তলায় থাকবে ডায়ালাইসিস সেন্টার ও আইসোলেশন ইউনিট।
নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা জানান, নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ এখন পর্যন্ত ৯০ ভাগ সমাপ্ত হয়েছে। তবে চুরি হয়ে যাবার ভয়ে ভবনের ভিতর বেসিন, বাথরোমের কমোড, লাইট, ফ্যান, লিফ্ট ইত্যাদি লাগানো হয়নি। এছাড়াও রং করার কাজ বাকী রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এখনো যে স্থানে ইটের গাঁথুনি, আস্তর, টাইলস ও দরজা লাগানোর কাজ চলমান রয়েছে তা ২০২৫ সালের জুলাই মাসের দিকে নতুন টেন্ডারের কাজ চলমান। এটা মূল হাসপাতালের প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এটা আলাদা একটি প্রকল্প। যার ব্যয় ২০ লাখ টাকা। ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা টেন্ডারের কাজের সাথে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভবনটি বুঝে নিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তারা ভবন বুঝে নেয়ার জন্য তারিখ জানালে আমরা এক মাসের মধ্যে বাকী কাজগুলো সম্পন্ন করে দিবো।
অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, শতভাগ কাজ শেষ না করেই ভবন বুঝে নিতে বলা হচ্ছে। তারা পূর্ণাঙ্গ কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভবন গ্রহণে অনিচ্ছুক এবং এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ভবন নির্মাণ শেষ হলেও সেবা চালু করতে প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও প্রশাসনিক অনুমোদন এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান জানান, শতভাগ কাজ শেষ না করেই কেন আমাকে গণপূর্ত বিভাগ ভবন বুঝে নেয়ার জন্য চিঠি দিচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছি না। ভবনটির শতভাগ কাজ সম্পন্ন হলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তবেই ভবনটি বুঝে নেয়া হবে। এছাড়াও ভবনটির কাজ সম্পন্নের বিষয়ে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এখনো শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি। কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরো জানান, নবনির্মিত ভবনে আইসিও, সিসিও, ডায়ালাইসিস সেন্টার, বিশেষায়িত সেবা, চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালু করার জন্য জনবল, লজিস্টিক, আসবাবপত্র, নিরাপত্তারক্ষী ও প্রশাসনিক অনুমোদন প্রাপ্তির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। আবেদনের প্রেক্ষিতে কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই জনবল নিয়োগ, আসবাবপত্র, লজিস্টিক সাপোর্ট পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।
সুজন সুশাসনের জন্য নাগরিক এর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, মানুষের চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধির জন্য নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নিতকরণের জন্য ৮তলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে এখনো লোকবল নিয়োগ হলো না, যন্ত্রপাতিও এল না। তাই যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালটি চালু করতে যা যা প্রয়োজন, তা করার দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু ভবন নির্মাণ নয়, কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে দ্রুত জনবল নিয়োগ ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, হাসপাতালটি চালু হলে ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং স্থানীয় মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে।
সবমিলিয়ে, নরসিংদীর এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অবকাঠামোগত অসম্পূর্ণতার কারণে এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করে হাসপাতালটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।



