সোনারগাঁয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে উদ্বিগ্ন মানুষ, ৬ মাসে ৯ হত্যাকাণ্ড
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। এসব কারণে সোনারগাঁয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলার এমন অবনতি থেকে দ্রুত উত্তরণ চান এলাকাবাসী।
গত অক্টোরর থেকে চলতি মাস পর্যন্ত ছয় মাসে ৯টি হত্যাকাণ্ড, ৬টি ডাকাতি ও ১৩টি ছিনতাই ও ২টি ধর্ষণ ও একটি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এছাড়াও পুলিশের পক্ষ থেকে মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা না করার কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবীরা। ফলে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়ে চলছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর রেস্টুরেন্ট কর্মী সায়মা আক্তারের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। উপজেলার কাইকারটেক এলাকার স্কচটেপে মোড়ানে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৮ নভেম্বর সোনারগাঁয়ের নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বিজয় নগর এলাকায় রিজওয়ান নামের এক অটোচালকের লাশ উদ্ধার করা হয়।
একই দিনে চৈতি কম্পোজিটের বিপরীত পাশ থেকে আরো এক অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৮ ডিসেম্বর সকালে উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের একরামপুর এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে ওমর নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০ জানুয়ারি সকালে প্রতিবন্ধী অটোরিক্সা চালক সোহেল রানার লাশ মুছারচর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি ১৯ জানুয়ারি বিকেলে অটোরিক্সা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় নিখোঁজ হন। পরদিন সকালে জামপুর ইউনিয়নের মুছারচর এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৩০ জানুয়ারি সকালে মোগরাপাগড়া ইউনিয়নের মাঝিপাড়া এলাকা থেকে অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের পাকুন্ডা এলাকা থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়।
১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে নোয়াগাঁও ইউনিয়নের পরমেশ্বরদী এলাকায় নাঈম নামের এক যুবককে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। সুদের টাকা লেনদেনে তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এঘটনায় পরদিন তার বড়ো ভাই নাসিমুল ইসলাম বাদি হয়ে সোনারগাঁ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
১ লা মার্চ কাঁচপুর দক্ষিণপাড়া এলাকার একটি ডোবার পাশ থেকে এক কিশোরের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয় এ কিশোরকে দুমাস আগে হত্যা করে এ ডোবার পাশে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। এ কঙ্কালটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়।
সোনারগাঁ হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সমানতালে বেড়ে চলছে ডাকাতির ঘটনা। বাসা বাড়ি ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ে সড়ক এখন ডাকাত আতঙ্কের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। গত কয়েকমাসে ঘটে যাওয়া ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাতে মহাসড়কের সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন, নয়াগাঁও এবং আষাঢিয়ারচর এলাকায় তিনটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ওই রাতে তারেক রহমানের জন্য পূর্বাচলে আয়োজিত সংবর্ধনা যোগ দিতে যাওয়াকালীন সময়ে পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় ডাকাতদের হামলার শিকার হন কুমিল্লার লালমাই থানার বিএনপির নেতা শহীদ, বাবুল মেম্বার, মনির হোসেনসহ কয়েকজন বিএনপি নেতা। তাদের গাড়ি ভাঙচুর করে নগদ টাকা, মোবাইল সেটসহ সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। হামলায় আহত হন অন্তত বিএনপির পাঁচ নেতা।
একই রাতে আষাঢিয়ারচর এলাকায় আরেকটি গাড়ি বহরে থাকা বিএনপি নেতাদের উপর হামলা করে তাদের সর্বস্ব লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ভোরে নয়াগাঁও এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাতদের হামলায় শিকার হন কাতার প্রবাসী রিফাতুজ্জামান।
৩ জানুয়ারি আবু আইয়ুব আনসারী নামের এক ইসলামী বক্তা মেঘনা ব্রিজের সামনে ডাকাতের কবলে পড়েন। এ ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে। পোস্টে তিনি লেখেন, কাঁচপুর থেকে সোনারগাঁও মেঘনা ব্রিজের পুরো রাস্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম ছিল। আর এই জ্যামের মধ্যেই একের পর এক বাস প্রাইভেট কার মাইক্রোবাস ভাঙচুরসহ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এটা আসলে অত্যন্ত দুঃখজনক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো একটি জায়গা কেন প্রশাসনের চোখে পড়েনি। এই হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তার অবস্থা।
এছাড়াও ২৬ নভেম্বর রাতে এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের উটমা ব্রীজ এলাকায় ডাকাতরা ৫জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে তিন লক্ষাধিক টাকা লুট করে নিয়ে যায়। ২১ ডিসেম্বর রাতে মোগরাপাড়া ইউনিয়নের মামরকপুর এলাকায় সৌদি প্রবাসী লিটন মিয়ার বাড়িতে ডাকাত দল হানা দিয়ে ৫ ভরি স্বর্ণ, মোবাইল সেট, নগদ টাকাসহ প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকার লুট করে নিয়ে যায়। ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দড়িকান্দি এলাকা থেকে চালভর্তি একটি ট্রাক ডাকাতি করে নিয়ে যায় ডাকাত দল।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি হাতকোপা এলাকায় সৌদি প্রবাসী সজিব মিয়ার বাড়িতে ডাকাতরা ৯ ভরি স্বর্ণ, ১৬ ভরি রুপা ও নগদ ১০ হাজার টাকাসহ ২২ লাখ টাকার মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এঘটনায় প্রবাসী সজিব মিয়ার মা মনোয়ারা বেগম বাদি হয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তবে ঘটনা চুরি হিসেবে উল্লেখ না করায় ওসি মামলা গ্রহণ করেনি। এঘটনায় বাদি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও ৯ জানুয়ারি পৌর এলাকার খাগুটিয়া গ্রামের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটে। একের পর এক ডাকাতি ও চুরির ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের পাকুন্ডা এলাকা থেকে বস্তল পর্যন্ত গত ৬ মাসে ৬টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও মেঘনা টোল প্লাজা থেকে শুরু করে কাঁচপুর পর্যন্ত বিভিন্ন যাত্রীবাহী ও মালবাহী গাড়িতে ৭টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ, ৫ মার্চ রাতে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় অন্তর নামের এক যুবকের গতিরোধ করে মারধর করে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মানুষ তাদের জান ও মালের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অপরদিকে গত ২৮ নভেম্বর কাঁচপুর ইউনিয়নের চেঙ্গাইন এলাকায় এক ভিক্ষুক নারীকে রক্ষণের চেষ্টার ঘটনা আলোচিত হয়ে উঠে। এছাড়াও ২রা মার্চ সন্ধ্যায় একই ইউনিয়নের কুতুবপুর এলাকায় এক অনার্স পড়ুয়া এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত রহমতকে স্থানীয়রা আটক করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয়।
অপরদিকে, মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশের কোন প্রকার ভূমিকা না থাকায় স্থানীয় সাংসদ আজহারুল ইসলাম মান্নান উপজেলা পরিষদের আইনশৃঙ্খলা সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের তালিকা প্রকাশের জন্য সোনারগাঁ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। মাদক নির্মূলে পুলিশের কোনো প্রকার অভিযান না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘটতে থাকা ধারাবাহিক এসব ঘটনায় একদিকে এলাকায় যেমন : চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে, অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চরম বার্তাও দিচ্ছে। সাধারণ ও সচেতন মানুষ এ নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসনকে কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সোনারগাঁ শাখার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মামুন বলেন, দিন দিন আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় রয়েছে। টানা কয়েকদিনের পরিস্থিতিতে লাইভে এসে থানা জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার না করায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিতে পুলিশকে চরম মূল্য দিতে হবে।
সোনারগাঁ থানার ওসি মো. মহিববুল্লাহ বলেন, মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সামায় দিচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত মামলা হচ্ছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কেউ ঘরে বসে আইনশৃঙ্খলা বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে কিছু করার নাই। থানায় এসে ওসি পরিস্থিতি বিষয়ে অবগত করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, নিয়মিতভাবে মহাসড়কের মাদক কারবারি গ্রেপ্তারে চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। বিট পুলিশিংয়ের সভার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। নির্বাচন ও রমজানের কারণে বিট পুলিশিং সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ঈদের পর থেকে নিয়মিতভাবে কার্যক্রম শুরু করা হবে। অপরাধ নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, মাদকে সোনারগাঁয়ের আনাচে কানাচে ছেয়ে গেছে। পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। মাদক নির্মূলে পুলিশের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। মাদক সেবী ও মাদক বিক্রেতাদের তালিকা প্রকাশসহ দ্রুত মাদক নির্মূলে ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।



