র্যাব সদস্য হত্যার পর প্রকাশ্যে হুমকি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনের
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম
জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের ওপর হামলার ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে এলাকাটির ভয়াবহ বাস্তবতা। চার দশকের বেশি সময় ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতিগুলো এখন সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি র্যাব-৭ এর একটি দলকে ঘিরে ধরে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, লাঠিসোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে প্রকাশ্যে এ আক্রমণ চালানো হয়, যা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জন্যও এলাকাটি কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তা স্পষ্ট করে।
এ হামলায় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার মৃত্যু গোটা দেশকে নাড়া দিয়েছে। ঘটনা আলোচনায় উঠে এসেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনের নাম, যাকে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে মামলায় আসামি করা হয়। র্যাব সদস্য হত্যার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে র্যাবকে ‘নির্মূল’ করার হুমকি দিয়ে তার দুঃসাহস আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে, জঙ্গল সলিমপুর কি এমন একটি এলাকা, যেখানে রাষ্ট্রের আইন অকার্যকর?
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানাধীন জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের নামে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করা হবে না। কাউকে ধরতে হলে অভিযানের আগে আসামির নাম-ঠিকানা জানতে হবে। এসব কথা বলেছেন জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন।
তিনি বলেন, এসব ক্রাইমের ফাঁদে পাড়া দিয়া কেউ যদি কোনো ঝামেলা করে, এতে কিন্তু বড়ো ধরনের পাবলিক বিস্ফোরণ ঘটবে।
ইয়াছিনের এসব বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার বিকেলে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে নিজের কার্যালয়ে তিনি এসব বক্তব্য দেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, প্রায় ২৯ মিনিট বক্তব্য দিয়েছেন ইয়াছিন। এ সময়ে তিনি বারবার বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের জায়গা তাদের ক্রয় করা সম্পত্তি এবং এখান থেকে কাউকে উচ্ছেদ করতে পারবে না। এর আগে সাবেক এক জেলা প্রশাসক উচ্ছেদ করতে গিয়ে উধাও হয়েছেন।
ভিডিওতে ইয়াছিন দাবি করেন, সাদাপোশাকে আসায় র্যাব সদস্যদের ডাকাত ভেবে হামলা চালানো হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে কোনো সরকারি পোশাক বা চিহ্নযুক্ত গাড়ি দেখা যায়নি, একটি সিভিল গাড়ি থেকে লোকজন নেমে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে, যা ডাকাতির মতো মনে হয়েছে।
তিনি র্যাবের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির ইঙ্গিত দেন এবং বলেন, দেশে বহু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকা সত্ত্বেও র্যাবকে ঘিরেই কেন এত বিতর্ক ও বদনাম।
এ ছাড়া তিনি জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা প্রশাসনের দুর্বলতার ফল বলেও উল্লেখ করেন এবং র্যাব বিলুপ্তির দাবিতে অতীতে সুশীল সমাজ থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
ইয়াছিন জঙ্গল সলিমপুরে গত সোমবার পরিচালিত র্যাবের অভিযানের সততা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। র্যাব সদস্যরা কেন অভিযান পরিচালনা করেছেন তা তদন্ত করার দাবি জানান।
এ ছাড়া তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনকে অস্থিরতার জন্য দায়ী করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সোমবার ইয়াসিনের পক্ষের লোকজন ওই এলাকায় বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধনের কর্মসূচি ঘোষণা করলে র্যাব ৪০ জনের একটি দল তৎক্ষণাৎ সেখানে যায়।
সেখানেই হামলার শিকার হন র্যাব সদস্যরা। ঘটনাস্থল থেকে অন্য সদস্যরা সরে গেলেও র্যাবের চার সদস্য ও তাদের তথ্যদাতাকে ইয়াসিনের লোকজন আটকে নিয়ে যান। পরে তাদের অটোরিকশায় করে তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ের ভিতরে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে তারা দ্রুত একটি দল পাঠিয়ে আটকে পড়া চার র্যাব কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। আহত বাকি তিন র্যাব সদস্য বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাদের ওপর সন্ত্রাসী ইয়াছিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়। চার র্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আসামিরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। মামলায় ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে আরও ২০০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
র্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহীদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, প্রায় ৫০ জনের ওপরে র্যাব সদস্য ছিলেন। অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করা যাবে এই ধারণায় তারা সেখানে যান। এখন একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছি। তারা অনুসন্ধান করবে, অভিযানে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা।



