Logo
Logo
×

সারাদেশ

ডিসি জাহিদের রুচিশীল উদ্যোগের প্রশংসা

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম

ডিসি জাহিদের রুচিশীল উদ্যোগের প্রশংসা

চট্টগ্রামের লেখক স্বপন কুমার দাশ শহরের ডিসি হিলে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ করেন প্রায় ৩৪ বছর ধরে। এক সময় তিনি ব্যবসা করতেন। ২০১৮ সালে স্ট্রোক করার পর সন্তানদের পরামর্শে পরিবহন ব্যবসা ছেড়ে অবসর জীবন শুরু করেন।

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে স্বপন দাশ বেশ নিঃসঙ্গ। বন্দরনগরীর খুলশি এলাকার একটি ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকেন। তার দুই সন্তান বিদেশে ব্যারিস্টারি পড়ছেন। নিঃসঙ্গ জীবনে তার দিন শুরু হয় ডিসি হিলে প্রাতঃভ্রমণের মাধ্যমে। তবে কয়েক যুগ ধরে ডিসি হিলের কোনো সংস্কারকাজ না থাকায় প্রশাসনের ওপর তিনি বেশ বিরক্ত ছিলেন।

সম্প্রতি, নবাগত জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে ডিসি হিলের নান্দনিক সংস্কারকাজ শুরু হলে উচ্ছ্বসিত হন স্বপন দাশ। প্রাতঃভ্রমণকারীদের পক্ষ থেকে হঠাৎ করেই তিনি সোমবার (১৯ জানুয়ারি) জেলা প্রশাসকের কাছে উপস্থিত হন।

জেলার অভিভাবক নাগরিকদের এই সামান্য কৃতজ্ঞতায় ধন্যবাদ পেয়ে আবেগে আপ্লুত হন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বাসায় ফেরার পথে টেলিফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন স্বপন দাশ।

তিনি বলেন, আমি ৩৪ বছর ধরে ডিসি হিলে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ করছি। অবসর জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এই ডিসি হিল। জেলা প্রশাসক যে নান্দনিকভাবে ডিসি হিলের সংস্কারকাজ করেছেন, তা তার রুচিশীল মনের পরিচয় দেয়। ব্যস্ততার মাঝেও তিনি আমাকে ডিসি হিলের সৌন্দর্য বৃদ্ধির নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ডিসি হিলের পরিবেশ অনেকটাই বদলে যাবে।

এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, মানুষের মধ্যে ডিসি হিলকে ঘিরে সবসময় একটি উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ থাকে। এখানে শহরের বিপুলসংখ্যক নাগরিক আসেন, যাদের সারাদিন বদ্ধ পরিবেশে কাটে। তারা সকাল কিংবা বিকেলে এখানে হাঁটতে আসেন। কিন্তু আমি যখন এখানে যোগদান করি, তখন ডিসি হিলের হাঁটার জায়গা ও বসার জায়গাগুলো দেখে মনে হয়েছে, এটি রুচিসম্মত কিংবা স্বাস্থ্যকর নয়।

তিনি আরও বলেন, সেদিন থেকেই আমি ভাবতে শুরু করি, কীভাবে এটিকে সুন্দর করে সাজানো যায়। এই শহরের মানুষের জন্য খোলা জায়গা খুবই সীমিত। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে একটু শ্বাস নেওয়ার মতো জায়গার অভাব রয়েছে।

প্রথমদিকে আমরা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেছি। এরপর রং করেছি। সেখানে যে একটি ফোয়ারা রয়েছে, সেটি সংস্কার করা হবে। পাশাপাশি দুটি মঞ্চ সংস্কার করা হবে। রাস্তা সংস্কারের কাজও সম্পন্ন করেছি। এছাড়া আমি লক্ষ্য করেছি, আমাদের তরুণ প্রজন্ম সেখানে ঘুরতে আসে। কিছু জায়গা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। পুরো এলাকাজুড়ে থার্ড লাইট বসানো হয়েছে, যাতে কারও নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, এর বাইরে আরও বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে একটি ওয়াশ ব্লক করা হবে এবং বিভিন্ন জায়গায় সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি ভাস্কর্য রয়েছে সেখানে। ওই স্থানটিকে কীভাবে আরও নান্দনিক ও মানসম্মত করা যায়, সে বিষয়েও পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সুন্দর ডাস্টবিনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এই জায়গাটিকে কীভাবে আরও আনন্দময় করা যায় এবং মানুষ যেন স্বস্তি পায়—সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।

চট্টগ্রাম শহরের নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির সড়কে অবস্থিত ডিসি হিলে সকাল, বিকেল এমনকি সন্ধ্যায়ও এই পাহাড়ের পাদদেশে অনেক মানুষ শ্বাস নিতে আসেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ডিসি হিলের নান্দনিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন নিয়মিত প্রাতভ্রমণে আসা নাগরিকগণ।

পাহাড়ের শীর্ষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সরকারি বাসভবনও অবস্থিত। বিষয়টি তার চোখেও ধরা পড়ে। দ্রুত তিনি প্রাথমিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন। ডিসি হিলের নান্দনিক পরিবেশ আরও দৃষ্টিনন্দন করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে জেলা প্রশাসন সূত্রে।

প্রাথমিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অবকাঠামোতে নতুন করে সাদা ও লাল রঙের কাজ করা হয় জেলার অভিভাবকের নির্দেশে। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে কিছু ল্যাম্পপোস্টও স্থাপন করা হয়। অবহেলিত ডিসি হিলের এই সামান্য উন্নয়ন কাজেও ভীষণ খুশি প্রাতভ্রমণে আসা বিভিন্ন প্রাতভিত্তিক সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা। তারা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে তার এই ছোট উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান।

৪২ বছরে পা রাখা শতায়ু অঙ্গনের সদস্যদের পক্ষ থেকে একটি ব্যানার টাঙানো হয়। সেখানে লেখা ছিল— ডিসি হিলকে নতুন রূপে প্রাণবন্ত করে তোলার মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করায় জেলা প্রশাসককে আন্তরিক অভিনন্দন।

‘ইয়োগা প্রভাতি’ নামের সংগঠনের ব্যানারে লেখা হয়— অবহেলিত ডিসি হিলকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলার মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

‘প্রভাতী আড্ডা’ নামের সংগঠনের ব্যানারে লেখা হয়— আমাদের সকলের ভালোবাসা ও ভালো লাগার স্থান ডিসি হিল অঙ্গনকে নতুন সাজে সাজিয়ে তোলায় মাননীয় জেলা প্রশাসককে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

‘উজ্জীবন’ নামের সংগঠন ব্যানারে লিখে— ডিসি হিলকে নতুন রূপে প্রাণবন্ত করে তোলার মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করায় মাননীয় জেলা প্রশাসককে আন্তরিক অভিনন্দন।

এ বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ‘ভোরের ডাক’ এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান ভুঁইয়ার সঙ্গে। ডিসির ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, নতুনভাবে সজ্জিত হয়েছে ডিসি হিল। আগে ভাঙাচোরা ছিল, কোনো রং ছিল না। দেখতে বিশ্রী লাগত। এখন রঙ করা হচ্ছে, দেখতে সুন্দর লাগছে।

তিনি আরও বলেন, লাইটিং করায় জায়গাটা অনেক সুন্দর লাগছে। আগে নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া হতো না। ২০-২৫ দিন পরপর একবার ঝাড়ু দেওয়া হতো। কুকুর পায়খানা করত, পাগলেরা ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখত। ডিসি সাহেব লাইটিং করে আমাদের মনকেও আলোকিত করেছেন। এখন অনেক মানুষ ডিসি হিলে যেতে উৎসাহিত হচ্ছেন। ব্যায়াম ও হাঁটাহাঁটি করা মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে।

আরেক প্রাতভিত্তিক সামাজিক সংগঠন ‘উজ্জীবন’-এর সভাপতি মিল্টন ঘোষ বলেন, আমরা ২০০৪ সাল থেকে ডিসি হিলে আছি। আমি দায়িত্ব পালন করছি ২০১৫ সাল থেকে। আমাদের মধ্যে কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন। দৈনন্দিন চাপ কমানোর জন্য আমরা প্রতিদিন সকালে এখানে হাঁটাহাঁটি করি।

আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়কে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছি একটি বিশেষ কারণে। দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় কোনো ডিসি এভাবে ডিসি হিল সাজানোর উদ্যোগ নেননি। উনি ব্যতিক্রম। প্রশাসনে থেকে যিনি আমাদের মানসিকভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাকে ধন্যবাদ জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এতে তিনি উৎসাহিত হবেন।

সারাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন প্রাতভিত্তিক সংগঠন শতায়ু অঙ্গনের সভাপতি রুস্তম আলী আক্ষেপের সুরে বলেন, আগেও অনেক ডিসি ছিলেন, কিন্তু কেউ করেননি। এই ডিসি করেছেন। ডিসি হিল চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রবিন্দু। এই পাহাড়কে ঘিরে শহরবাসীর অনেক স্বপ্ন ও ভালোবাসা। আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকার একটি বড় জায়গা হলো এই ডিসি হিল। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে হাঁটাহাঁটি করে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এটি নগরবাসীর খুব প্রিয় জায়গা। সারাদিনের ক্লান্তির পর সেখানে গেলেই মন ভালো হয়ে যায়।

ইতিহাস বলে, ইংরেজ শাসনামলের গোড়ার দিকে এখানে চাকমা রাজার বাড়ি ছিল। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বাসভবন স্থাপিত হওয়ায় কালক্রমে এই পাহাড় ‘ডিসি হিল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন