পৌষ সংক্রান্তিতে বিনীরাইলে ২৫০ বছরের ‘জামাই মেলা’
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:০০ এএম
পৌষের কনকনে শীত উপেক্ষা করে ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বিনীরাইল এলাকা। উপলক্ষ ২৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জামাই মেলা’ নামে। পঞ্জিকা অনুযায়ী বুধবার পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে বসেছে উত্তর জনপদের অন্যতম বৃহৎ এই মাছের মেলা।
এই মেলার মূল আকর্ষণ বিশাল আকৃতির সব মাছ। কয়েক শ বছরের রীতি অনুযায়ী, মেলা উপলক্ষে আশপাশের গ্রামের জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন। শ্বশুরবাড়িতে বড় মাছ নিয়ে যাওয়াকে এখানে আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শুধু জামাইরাই নন, শ্বশুরেরাও বড় মাছ কিনে জামাইকে আপ্যায়ন করার এক ধরনের আনন্দময় প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন।
মেলায় শত শত বিক্রেতা মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। তাঁদের একজন সিলেটের বড়লেখা থেকে আসা শৈবাল দাস। তিনি নিয়ে এসেছেন ৩০ থেকে ৪৫ কেজি ওজনের একাধিক বাঘাড় এবং বিশাল আকৃতির চিতল মাছ। শৈবাল দাস বলেন, তিন দিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে বড়লেখা থেকে এসেছি। এবার বাঘাড় আর আইড় মাছের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ৪৫ কেজি ওজনের একটি বাঘাড় মাছের দাম হাঁকছি ৬৫ হাজার টাকা। ক্রেতাদের ভিড় দেখে মনে হচ্ছে, দুপুরের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাবে।
ময়মনসিংহ থেকে মাছ নিয়ে আসা আরেক বিক্রেতা সিয়াম হোসেনের স্টলে শোভা পাচ্ছে বড় বড় রুই, কাতল ও বোয়াল মাছ। তিনি বলেন, ময়মনসিংহের হাওর ও নদী থেকে সেরা মাছ সংগ্রহ করে এনেছি। বিনীরাইলের মেলার নাম এখন সারা দেশেই পরিচিত। এখানে মাছ বিক্রির পাশাপাশি উৎসবের আবহ উপভোগ করাটাই বড় আনন্দ। আগের কয়েক বছরের তুলনায় এবার ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি।
মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন আয়োজকেরা। ঢাকার উত্তরা থেকে আসা দর্শনার্থী মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রতিবছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। এখানে শুধু মাছ কেনা নয়, হাজার হাজার মানুষের মিলনমেলা আর বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখাটাই বেশি ভালো লাগে। এবার মাছের সরবরাহ ও বৈচিত্র্য দুটোই চোখে পড়ার মতো।
বড় মাছের দরদামে ব্যস্ত স্থানীয় জামাই সৈকত হোসেন বলেন, এবারই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে মাছ নিয়ে যাব। তাই সবচেয়ে ভালো মাছটা খুঁজছি। ১৮ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ পছন্দ হয়েছে, দাম চেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। জামাই হিসেবে এমন বড় মাছ নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে পারা সত্যিই গর্বের।
আয়োজক কমিটি জানায়, ব্রিটিশ শাসনামলে শুরু হওয়া এই মেলা এখন আর কোনো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এটি এখন একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। মাছের পাশাপাশি মেলায় আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যের স্টলও বসেছে।
বংশপরম্পরায় চলে আসা এই মেলা আজ প্রায় ২৬০ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও বিনীরাইলের এই মাছের মেলা আজও তার স্বাতন্ত্র্য ও জৌলুশ ধরে রেখেছে, যা গাজীপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছে।



