রাখাইন ত্রিমুখী সংঘাতে এপারে পালিয়ে এলো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্য
কক্সবাজার প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে ত্রিমুখী সংঘাত চলছে। দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠি আরাকান আর্মির আস্তানা ঘীরে দেশটির সেনা বাহিনী বিমান ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠির সদস্যরা সেনা বাহিনীর পক্ষে হয়ে স্থলেভাগে আরাকান আর্মির সাথে সংঘাত করছে। এ পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির হামলায় টিকতে না পেরে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্য। যাদের ইতিমধ্যে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
ত্রিমুখী হামলা ও গুলিবর্ষণের শব্দে আতঙ্কিত কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের মানুষ। এরই মধ্যে এপারে গুলি এসে এক শিশু আহত হয়েছে।
রবিবার সকালে এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইকং এলাকায় মহাসড়কে ব্যারিকেড দেয় স্থানীয় গ্রামবাসী। পরে বিজিবি, সেনাবাহিনী, র্যাব সহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মিয়ানমার থেকে ছোঁড়া গুলিতে গুরুতর আহত হুজাইফা আফনান ওরফে পুতুনি (১২) হোয়াইকং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদ জসিমের মেয়ে, সে লম্বাবিল হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।
প্রথমে পুলিশের পক্ষে ' শিশুটি মারা গেছে ' বলা হলেও দুপুর আড়াইটায় গণমাধ্যমকে টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রথম উদ্ধুদ্ধ পরিস্থিতিতে সবাই মনে করেছে শিশুটা মারা গেছে, কিন্তু তা সঠিক নয়। কুতুপালং হাসপাতাল থেকে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় কক্সবাজারে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। চমেকে আইসিইউতে রয়েছে। তবে অবস্থা আশংকাজনক।
টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, 'বিজিবি ও পুলিশ ওপারের ৫৩ জন রোহিঙ্গা বিদ্রোহীকে আটক করে, বর্তমানে তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এবিষয়ে পরবর্তীতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিজিবির কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, দুপুরের দিকে ওপারের সংঘর্ষে টিকতে না পেরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্য সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এসময় বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা তাদের হেফাজতে নিয়ে আসে।
শিশু আফনান গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাস্তায় এসে বিক্ষোভ করে স্থানীয় জনতা, করা হয় মহাসড়ক অবরোধ। পরে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে।
উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী জানিয়েছেন , ' সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ শুরু করেছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। জনগণ অবরোধ তুলে নিয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় কোন বিদেশি বিদ্রোহী গোষ্ঠী থাকতে পারবে না। আমরা চাইনা ওপারে ঘটনায় এপারে কোন বাংলাদেশি ক্ষতিগ্রস্ত হোক।'
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল জানান, মিয়ানমার থেকে ছোঁড়া গুলি এক বাংলাদেশি শিশু আহত হওয়ার পর আশংকাজনক হওয়ায় মারা গেছে বলে প্রচার হয়। এতে স্থানীয় লোকজন সড়ক অবরোধ করেছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহ জনপ্রতিনিধি পরিস্থিতি শান্ত করে নিশ্চিত হওয়া গেছে শিশুটি মারা যায়নি। তাকে আশংকাজনক চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। এদিকে পালিয়ে আসা ৫৩ জন পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।
সীমান্তের লোকজন জানিয়েছেন, শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার পর্যন্ত টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের খুব কাছে রাখাইনে এ সংঘর্ষ হচ্ছে। এখনো বোমা বিস্ফোরণ এবং শত-শত গোলাগুলির ফায়ার চলমান। খুব থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিক বলেন, সকালেও প্রচুর গোলাগুলি হয়েছে। এসময় একটি বুলেট আমার পায়ের সামনে মাটিতে পড়ে। অল্পের জন্য রক্ষা পেলাম।
আরেক বাসিন্দা মো. ছৈয়দ হোসেন বলেন, হোয়াইক্যং সীমান্তের কাছে পরিস্থিতি ভয়াবহ। এপারের সাধারণ মানুষ অনিরাপদ মনে করছে। বাড়ি-ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, গত তিনদিন হোয়াইক্যংয়ের ওপারে রাখাইন সীমান্তে দিনে-রাতে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত শত শত রাউন্ড গুলির ফায়ার ও একের পর বোমা বিস্ফোরণের শব্দে এপারের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাঘাত ঘটছে। সেখান থেকে ছোড়া গুলি এপারে এসে পড়ছে। মানুষের চিংড়ি ঘেরে ও চাষের জমিতে গুলি এসে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, রোববার সকাল থেকে এখনো গোলাগুলি ও বোমার বিস্ফোরণ হচ্ছে।
পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গা বলেন, রাখাইন সীমান্তের কাছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গ্রুপের সঙ্গে আরাকান আর্মির মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। আমি সেখানে থাকতে না পেরে চলে আসছি। মাঝে মধ্যে জান্তা বাহিনীও আক্রমণ করছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।



