রূপগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় ময়লার বাগার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে হাজারো শিক্ষার্থী
রুপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
ছবি : যুগেরচিন্তা
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের প্রধান কার্যালয়ের কোল ঘেঁষে মুড়াপাড়া ইউনিয়নের উপজেলা প্রধান সড়ক ডায়াবেটিস ও শিশুপার্ক এবং ব্লু হরিজন জুট এন্ড টেক্সটাইল লিঃ পাশে গড়ে ওঠা বিশাল এক ময়লার ভাগাড় এখন কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এই মরণফাঁদ মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। স্কুল কলেজ মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সময় নাক চেপে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হচ্ছে। উৎকট দুর্গন্ধ আর ময়লা পোড়ানো বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে তারা, অথচ উপজেলা প্রশাসনের চোখের সামনে এমন চিত্র থাকলেও যেন দেখার কেউ নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। সড়কের একাংশ জুড়ে ময়লার স্তূপ থাকায় শিক্ষার্থীদের মূল রাস্তা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন এই ময়লার স্তূপে আগুন দেওয়া হয়। আগুনের কুণ্ডলী আর প্লাস্টিক পোড়া কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
স্কুলে যাওয়ার পথে এক শিক্ষার্থী জানায়,এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় নিঃশ্বাস নিতে পারি না। চোখ জ্বালাপোড়া করে এবং জামাকাপড়ে পচা গন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় ধোঁয়ার কারণে রাস্তা দেখা যায় না, ভয় লাগে কখন গাড়ির নিচে পড়ে যাই।
নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সঞ্জয় কুমার সাহা বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন পোড়ানো ধোঁয়ায় 'কার্সিনোজেনিক' উপাদান থাকে যা শিশুদের এজমা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে,দীর্ঘমেয়াদী হাঁপানি এবং ফুসফুসের জটিলতার প্রধান কারণ। প্রতিদিন এই বিষাক্ত বাতাস গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,আমাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য পাঠাই, কিন্তু এই বিষাক্ত পরিবেশ তাদের অসুস্থ করে দিচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন অব্যবস্থাপনা মেনে নেওয়া যায় না। ধোঁয়ার কারণে রাস্তায় দৃষ্টিসীমা এতটাই কমে যায় যে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই দ্রুতগামী যানবাহনের সামনে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে শীতের সকালে কুয়াশা আর ধোঁয়া মিশে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যে কোনো সময় এখানে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।সরকারি আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক এলাকার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে বর্জ্য ফেলা বা পোড়ানো দণ্ডনীয় অপরাধ। রূপগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে এভাবে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে ময়লা পোড়ানো হলেও রহস্যজনক কারণে নীরব রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অবিলম্বে এই ময়লার ভাগাড় অপসারণ করে একটি পরিকল্পিত ডাম্পিং জোন তৈরি করা হোক। অন্যথায় হাজারো শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে এলাকাবাসী কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
মোহনা আক্তার শহীদুন্নেছা গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী বলেন,প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় এই রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। ময়লার দুর্গন্ধে বমি আসে। তার ওপর যখন প্লাস্টিক পোড়ানো হয়, তখন ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে থাকে। দম বন্ধ হয়ে আসে আমাদের।
তানজিনা শহীদুন্নেছা গার্লস স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী বলেন,স্কুলে যাওয়ার পথে এই ধোঁয়া সরাসরি চোখে-মুখে লাগে। এর ফলে সারা দিন চোখে জ্বালাপোড়া করে এবং মাথা ধরে থাকে। ক্লাসে গিয়ে পড়াশোনায় মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা তো এখানে বিষাক্ত বাতাস নিচ্ছি, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করছে।
রূপায়ন কিন্ডার গার্ডেন এবং হাই স্কুলের শিক্ষক খন্ধকার মামুন বলেন, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে আমাদেরকে স্কুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। প্রতিদিন অভিভাবকর ও শিক্ষার্থীরা আমাদের কাছে অভিযোগ করছে ময়লা দুর্গন্ধ ও প্লাস্টিক পুরানো গন্ধে এ রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা যাচ্ছে না কিছু একটা করেন স্যার আমাদের বাচ্চাদের জন্য।
এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এখানে শুধু ময়লা ফেলা হচ্ছে না, বরং প্রতিদিন প্লাস্টিক ও ট্যানারি বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। এই বিষাক্ত ধোঁয়ায় কার্বন মনোক্সাইড ও ডাইঅক্সিনের মতো গ্যাস থাকে। আমরা যারা তরুণ, আমাদের ফুসফুস অকালেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রূপগঞ্জ চাই, ময়লার ভাগাড় নয়।
রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা খোঁজ খবর নিয়ে দেখবো কে বা কারা এখানে ময়লা আবর্জনা স্তূপ করেছে। ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে মোবাইল কোটের আওতায় আনা হবে।



