শীত উপেক্ষা করে কটিয়াদীতে ঘোড়দৌড়ে উৎসব, ফিরল গ্রাম বাংলার হারানো ঐতিহ্য
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১২ পিএম
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গ্রাম বাংলার প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে নানা শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ ছুটে আসেন এই ব্যতিক্রমী আয়োজন উপভোগ করতে। মাঠের চারপাশে জড়ো হওয়া দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাসে সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর উৎসবমুখর পরিবেশ। এমন আয়োজনে খুশি দর্শনার্থীরা আগামীতেও নিয়মিত ঘোড়দৌড় আয়োজনের দাবি জানান। আয়োজক কমিটিও ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে।
আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গত সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে কটিয়াদী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর এলাকায় পতিত ফসলি জমিতে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এলাকাবাসী। ঘোড়দৌড়কে কেন্দ্র করে উৎসবে মেতে ওঠে পুরো এলাকা। সকাল থেকেই আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের আগমনে অনেক বাড়িই মিলনমেলায় পরিণত হয়। কোথাও কোথাও আয়োজন করা হয় পিঠেপুলিরও।
বিকেলে প্রতিযোগিতা শুরু হতেই মাঠের চারদিকে হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। মুহুর্মুহু করতালি আর চিৎকারে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। শিশু, যুবক, বৃদ্ধের পাশাপাশি নারীরাও খেলা উপভোগ করেন সমান আগ্রহে। দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘোড়দৌড় দেখতে আসেন। অনেকেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে এসে এই উৎসবে যোগ দেন। প্রতিযোগিতাকে ঘিরে মাঠের পাশে বসে গ্রামীণ মেলা। নানা পণ্য, মিষ্টান্ন ও বাহারি খাবারের দোকানে জমে ওঠে বেচাকেনা।
প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মোট ১৪টি ঘোড়া অংশ নেয়। বড়, মাঝারি ও ছোট—এই তিন বিভাগে বিভক্ত হয়ে ঘোড়াগুলো প্রতিটি ধাপে প্রায় এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। তিন বিভাগেই প্রথম স্থান অর্জন করেন কটিয়াদীর বনগ্রামের রবিন মিয়া। দ্বিতীয় হন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার কাওসার এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেন কটিয়াদীর মানিকখালীর সোহাগ। প্রতিযোগিতা শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন সাবেক সংসদ সদস্য আনিসুজ্জামান খোকন। প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় রেফ্রিজারেটর, দ্বিতীয় পুরস্কার খাসি এবং তৃতীয় পুরস্কার এলইডি টিভি। অন্যান্য বিজয়ীদের জন্য ছিল ছাগল ও মোবাইল ফোনসহ আকর্ষণীয় পুরস্কার।
ঘোড়দৌড় দেখতে আসা দর্শক তাসলিমা আক্তার বলেন, টিভিতে ঘোড়দৌড় দেখেছি, কিন্তু সরাসরি কখনো দেখিনি। তাই বাবার সঙ্গে এখানে এসেছি। এমন আয়োজন দেখে খুব ভালো লাগছে। প্রতি বছর হলে অবশ্যই দেখতে আসব।
স্থানীয় যুবক রফিকুল ইসলাম মিলন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে এই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা আমাদের এলাকায় হচ্ছে। এটি এখন দুই ঈদের পর সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই এই আয়োজন নিয়মিত হোক।
আরেক দর্শক রাকিব হোসেন বলেন, ঘোড়দৌড় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। এখন আর সচরাচর দেখা যায় না। শুধু ঘোড়দৌড় নয়, অন্যান্য গ্রামীণ খেলাও নিয়মিত আয়োজন করা দরকার, তাহলে নতুন প্রজন্ম আমাদের সংস্কৃতি জানতে পারবে।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ইমরান হোসেন বলেন, পুরস্কারের জন্য নয়, মানুষকে আনন্দ দিতেই আমরা ঘোড়দৌড়ে অংশ নিই। এলাকার মানুষ আনন্দ পাচ্ছে, এটাই বড় বিষয়।
প্রথম স্থান অর্জনকারী রবিন মিয়া জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি ঘোড়দৌড়ের সঙ্গে যুক্ত। তার কাছে বর্তমানে চারটি দৌড়ের ঘোড়া রয়েছে। শারীরিক সক্ষমতা যতদিন থাকবে, ততদিন তিনি এই খেলায় অংশ নিতে চান।
আয়োজক কমিটির পক্ষে চাঁদপুর ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি মো. শহিদুজ্জামান সেলিম বলেন, তরুণদের বিনোদন দেওয়া এবং মাদক থেকে দূরে রাখতে আমরা এমন আয়োজন করি। গ্রাম বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতেই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক সংসদ সদস্য আনিসুজ্জামান খোকন বলেন, দীর্ঘদিন পর এলাকাবাসীর উদ্যোগে এমন ঐতিহ্যবাহী আয়োজন দেখে তিনি আনন্দিত। আগামী বছর আরও বড় পরিসরে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের আশ্বাস দেন তিনি।



