শিশুদের হাসিতেই সময় খুঁজে নিলেন মানবিক ডিসি
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
ছবি : যুগেরচিন্তা
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সড়কের পাশে কনকনে শীতের মধ্যে উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করতে গিয়ে নগরের খুলশী এলাকায় অবস্থিত উপলব্ধি ফাউন্ডেশন সম্পর্কে প্রথমবার জানতে পারেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
শিশুদের পুনর্বাসনের উপযুক্ত স্থান খুঁজতে গিয়ে জেলা প্রশাসকের নজরে আসে এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানার আগ্রহ থেকে তিনি শনিবার (৩ জানুয়ারি) উপলব্ধি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ইজাবুর রহমান এবং ব্যবস্থাপক শেলী রক্ষিতকে নিজ কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান।
জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কাজে চরম ব্যস্ততার মধ্যেও জেলা প্রশাসক প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ফাউন্ডেশনের মানবিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হন। আলোচনা শেষে সেদিনই তিনি প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানান।
এই সিদ্ধান্ত যে কেবল কথার কথা ছিল না, তা প্রমাণ করে দুই দিনের মধ্যেই—সোমবার (৫ জানুয়ারি) জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নিজে উপলব্ধি ফাউন্ডেশন পরিদর্শনে যান।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক ফাউন্ডেশনে আশ্রয়প্রাপ্ত হারিয়ে যাওয়া, স্বজনহীন ও ঠিকানাবিহীন অসহায় ভাসমান মেয়েশিশুদের খোঁজখবর নেন। তিনি তাদের শিক্ষা, বসবাস ও সার্বিক কল্যাণ বিষয়ে বিস্তারিত অবগত হন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭৫ জন মেয়েশিশু বসবাস করছে, যাদের অনেকেই নিজেদের ঠিকানা কিংবা আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। এসব শিশুর জন্য ‘উপলব্ধি ফাউন্ডেশন’ই একমাত্র আশ্রয় ও ঠিকানা।
এ সময় জেলা প্রশাসক শিশুদের জন্য এক বেলা খাবারের ব্যয় নির্বাহ এবং বই ক্রয়ের উদ্দেশ্যে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন। শীতের তীব্রতা বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটিতে আশ্রয়প্রাপ্ত শিশুদের জন্য ৮৫টি কম্বল বিতরণ করেন। পাশাপাশি জেলার অভিভাবক হিসেবে তিনি শিশুদের জন্য দুই ঝুড়ি সুস্বাদু ফল উপহার দেন। শিশুদের শিক্ষা ও সৃজনশীল বিকাশে সহায়তার লক্ষ্যে তিনি খাতা, কলম, রঙ পেন্সিল, ক্যালকুলেটরসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ প্রদান করেন। একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হিসেবে ব্যাডমিন্টন ব্যাট, নেট, কর্ক, বাস্কেটবল, দাবা বোর্ড ও লুডু বোর্ড তুলে দেন শিশুদের হাতে।
উপলব্ধি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ইজাবুর রহমান বলেন, “আমাদের এখানে আগেও অনেক জেলা প্রশাসক এসেছেন, তবে তারা সাধারণত বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমন্ত্রণে এসেছিলেন। কিন্তু এই জেলা প্রশাসক সাহেব আমাদের সম্পর্কে আগে থেকেই খোঁজ নিয়ে নিজ উদ্যোগে আমাদের অফিসে ডেকেছেন—এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং গর্বের বিষয়।”
তিনি আরও বলেন,“উনার ব্যস্ততার মাঝে আমাদের ডাকার কথা ছিল না। তবুও প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে আমাদের কার্যক্রম শুনেছেন। আজ উনি আমাদের রান্নাঘর পর্যন্ত ঘুরে দেখেছেন—বাচ্চাদের জন্য কী রান্না হচ্ছে, সেটাও নিজ চোখে দেখে গেছেন। নিশ্চয়ই উনি মানবিক বলেই এমনটা করেছেন।”
তিনি জানান, শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দেখে জেলা প্রশাসক এতটাই বিমোহিত হন যে, তিনি নিজের আসন ছেড়ে মঞ্চে উঠে শিশুদের সঙ্গে ছবি তোলেন।
“আজ আমাদের বাচ্চারা খুব আনন্দ করেছে, ফুর্তি করেছে,” বলেন শেখ ইজাবুর রহমান।
উপলব্ধি ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক শেলী রক্ষিত জেলা প্রশাসকের ভুয়সী প্রশংসা করে বলেন,“পথশিশুদের নিয়ে যার এত ভাবনা, তাকে আমরা নিঃসন্দেহে মানবিক ডিসি হিসেবেই দেখি। এখানে এসে তিনি খুব সহজেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে মিশে গেছেন। প্রায় প্রতিটি শিশুর সঙ্গে কথা বলেছেন—তারা কোথা থেকে এসেছে, এখানে কেমন আছে, এখানে কেমন লাগে—সবকিছু জানতে চেয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন,“উনি সত্যিই অধিকারবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন।”
উপলব্ধি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, “একটি প্রতিষ্ঠান এতটা হৃদয়গ্রাহী, এতটা সুন্দর এবং প্রাণবন্ত হতে পারে—তা আমার জানা ছিল না।”
তিনি বলেন,“উপলব্ধি নামটি প্রথম শুনেছিলাম আনোয়ারা উপজেলা থেকে উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর পুনর্বাসনের জায়গা খুঁজতে গিয়ে। নামটি শুনেই আমার ভেতরে নাড়া দিয়েছিল।”
তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন,“মানুষ তো নিজের সন্তানের কথাই ভাবে। কিন্তু অন্যের সন্তানের কথা কয়জন ভাবে? অথচ আমরা নিজেদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব বলে দাবি করি।”
জাতীয় নির্বাচনের ব্যস্ততার প্রসঙ্গ টেনে জেলা প্রশাসক বলেন,“আমরা যারা সরকারি চাকরি করি, আমাদের সময় আসলে সরকারের কেনা। সেই কেনা সময় থেকেই আমাদের মানুষের জন্য সময় বের করতে হয়। আজ এখানে যে সময় ব্যয় করেছি, সেটাই আমার শ্রেষ্ঠ সময়।”
শিশুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “তোমাদের মাঝে থাকতে পেরে আমার খুব ভালো লেগেছে। এই উচ্ছ্বাস, এই আনন্দই জীবন। স্বপ্ন দেখতে হবে। পৃথিবীতে যারা বড় হয়েছে, তারা সবাই কষ্ট করেই বড় হয়েছে।”
জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তিনি উপলব্ধি ফাউন্ডেশনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক বলেন, “সুবিধাবঞ্চিত ও স্বজনহারা শিশুদের সঠিক সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তারা সমাজের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতে দেশের সম্পদে পরিণত হবে।”
তিনি এ ধরনের মানবিক উদ্যোগে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ কামনা করেন। উল্লেখ্য, উপলব্ধি ফাউন্ডেশনে আশ্রয়প্রাপ্ত শিশুরা বর্তমানে নগরের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রয়েছে। পাশাপাশি তারা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক এবং আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতাসহ নানা ক্ষেত্রে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে।



