মানবিকতায় প্রশংসিত হাইওয়ে পুলিশ
ঢাকা–বগুড়া মহাসড়কে আত্মহননের মুখ থেকে মা ও শিশুকে উদ্ধার
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দিবাগত রাত। সময় তখন প্রায় ১টা। চারপাশে ঘন অন্ধকার আর হাড়কাঁপানো শীত। জনমানবশূন্য ঢাকা–বগুড়া মহাসড়কে মাঝেমধ্যে ভারী যানবাহনের গর্জন পরিবেশকে আরও আতঙ্কজনক করে তুলছিল। ঠিক এমন সময় বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায় মহাসড়কের মাঝখানে তিন বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক নারী। চোখেমুখে ছিল চরম হতাশা, মনে আত্মহননের ভয়ংকর সিদ্ধান্ত। দ্রুতগামী কোনো গাড়ির নিচে ঝাঁপ দিয়ে নিজের সঙ্গে শিশুটির জীবনও শেষ করার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
এই সংকটময় মুহূর্তে দেবদূতের মতো সেখানে হাজির হন শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের এসআই আলামিন ও তাঁর সঙ্গীয় ফোর্স। টহলরত অবস্থায় মহাসড়কের মাঝখানে মা ও শিশুকে অস্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁদের সন্দেহ হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে সময় নেননি তারা। মুহূর্তের মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসআই আলামিন এগিয়ে গিয়ে মা ও শিশুটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।
উদ্ধার হওয়া গৃহবধূর নাম আশা খাতুন (২১)। তিনি পারিবারিক অভিমানে নিজের এবং অবুঝ শিশুটির জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। উদ্ধারকালে দেখা যায়, তীব্র শীতে মা ও শিশু দু’জনই থরথর করে কাঁপছিলেন এবং প্রচণ্ড আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন। এসআই আলামিন তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের আশ্বস্ত করেন এবং মানবিক মমতায় আগলে রাখেন।
পরবর্তীতে মা ও শিশুকে হেফাজতে নিয়ে শেরপুর থানার এসআই তোফাজ্জলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জানা গেছে, আশা খাতুনের পিতা মৃত আশরাফ আলী, স্বামী মো. হাবিব (২৮), পিতা মৃত দুলাল। তাঁদের বাড়ি শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায়। এসআই তোফাজ্জল পরিবারের সদস্যদের ডেকে এনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মা ও শিশুকে তাঁদের পরিবারের কাছে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নেন। বর্তমানে মা ও শিশু পুলিশি তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছেন।
ঘটনা সম্পর্কে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে এসআই আলামিন বলেন, কর্তব্য পালন করতে গিয়ে অনেক ঘটনাই দেখতে হয়। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ওই শিশুটির মুখ দেখে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। মা হয়তো জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু ওই অবুঝ শিশুটির কী দোষ? আমরা শুধু আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। দুটি প্রাণ বেঁচেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এদিকে গভীর রাতে হাইওয়ে পুলিশের এমন সময়োচিত ও মানবিক উদ্যোগ শেরপুরজুড়ে প্রশংসার সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়, বিপদের মুহূর্তে মানুষের শেষ ভরসাস্থলও হতে পারে—এই ঘটনা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
যেখানে জীবন থমকে দাঁড়িয়েছিল আত্মহননের অন্ধকার প্রান্তে, সেখানে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের মানবিকতায় একটি পরিবার ফিরে পেয়েছে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।



