খিলগাঁও থানার ওসির বিরুদ্ধে শীর্ষ সন্ত্রাসীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
আরাফাত হোসেন
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীর স্ত্রী মারজিয়া আফরিন
রাজধানীর খিলগাঁও ও সবুজবাগ এলাকার চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, পেশাদার খুনি ও কুখ্যাত মাদক কারবারি খোরশেদ আলম ওরফে ‘পাগলা সোহেল’কে বিদেশি পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে স্থানীয় জনতা। তবে ঘটনার পর খিলগাঁও থানা পুলিশের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষকে সুবিধা দেওয়া এবং ভুক্তভোগীদের মামলা না নিয়ে উল্টো হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা নেওয়ার তীব্র অভিযোগ উঠেছে।
রোববার ২ আগস্ট এক অফিসে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীর স্ত্রী মারজিয়া আফরিন। এ সময় তিনি ‘পাগলা সোহেল’ এর পূর্বের সমস্ত অপরাধের রেকর্ড আমলে নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং খিলগাঁও থানার অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২৬শে তারিখ খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা বিদেশি পিস্তল এবং সুইচ গিয়ার চাকুসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী পাগলা সোহেলকে হাতেনাতে আটক করে। দীর্ঘদিন ধরে তার অস্ত্র, ডাকাতি ও মাদক সাম্রাজ্যের কারণে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে গণধোলাই দেয় এবং পরবর্তীতে তাকে খিলগাঁও থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
মারজিয়া আফরিন অভিযোগ করেন, ঘটনার দিনই তার স্বামীর ছোট ভাই হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে থানায় মামলা করতে গেলে খিলগাঁও থানার ওসি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, তদন্ত ওসি গোলাম মোস্তফা এবং ডিউটি অফিসার এসআই আকরাম মামলাটি গ্রহণ না করে গড়িমসি করতে থাকেন। সাক্ষীদের নাম ও বিবরণ রেখে পরে অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে তাদের বিদায় করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৩ বিধি অনুযায়ী কোনো জব্দ তালিকা (সিজার লিস্ট) তৈরি না করেই মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেয় পুলিশ। ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ২৭শে তারিখ ভুক্তভোগীদের মামলা ঝুলিয়ে রেখে উল্টো পাগলা সোহেলের স্ত্রী তারিন আক্তারের একটি কাল্পনিক ও মিথ্যা এজাহার গ্রহণ করে পুলিশ। যেখানে দাবি করা হয়, সোহেলকে ফাঁসানোর জন্য অন্য কেউ পাশ দিয়ে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে গেছে। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের অফিশিয়াল রেকর্ড ও সিডিএমএস (CDMS) ফাইলের তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, পাগলা সোহেল কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা ‘নিরীহ ঠিকাদার’ নয়। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, ডাকাতির প্রস্তুতি, নারী নির্যাতন এবং মাদক চোরাচালানের অন্তত ৬টি গুরুতর মামলা রয়েছে। এর মধ্যে খিলগাঁও থানাতেই রয়েছে ২টি অস্ত্র মামলা ও ৫টি মাদক মামলা।
এছাড়াও মোহাম্মদপুর থানায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি হত্যা মামলা এবং সবুজবাগ থানায় ১টি মামলাসহ অসংখ্য অপরাধের খতিয়ান রয়েছে তার। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালে ডিবি পুলিশের চেকপোস্ট থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে পালানোর সময় তার পকেট থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার হয়েছিল। ২০২৩ সালে খিলগাঁও থানা পুলিশই তার কাছ থেকে ২০০ গ্রাম খাঁটি হিরোইন উদ্ধার করে।
সর্বশেষ গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে র্যাব পরিচয় দিয়ে এক দুবাই প্রবাসীর কাছ থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ডাকাতির ঘটনায়ও সে জড়িত ছিল। এই ঘটনায় গত ২৪ মে ২০২৫ তারিখে ডেমরা থেকে তার সহযোগীদের র্যাব-৩ গ্রেপ্তার করলেও সোহেল কৌশলে পালিয়ে যায়। এর আগেও ২০১৪ সালের একটি অস্ত্র মামলায় জামিন পেয়ে ২০১৭ সালে হাজিরা না দিয়ে পলাতক থেকে সে নতুন অপরাধের সিন্ডিকেট গড়ে তোলে।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী মারজিয়া আফরিন বলেন, "পাগলা সোহেলের স্ত্রী নিজেকে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন। এই ভয়ঙ্কর অপরাধী যদি আবারও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বা জামিনে বের হয়ে আসে, তবে আমাদের মতো ভুক্তভোগীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
তিনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানান, যেন কোনো অবস্থাতেই এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীর জামিন না হয় এবং পূর্বের সব মামলার শক্ত তদন্তের মাধ্যমে তার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। একই সাথে অপরাধীকে সুবিধা দেওয়া খিলগাঁও থানার ওসি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, তদন্ত ওসি গোলাম মোস্তফা এবং এসআই আকরামের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের জোর দাবি জানান তিনি।



