বুধবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ৮ ১৪৩০

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

করীম রেজা

প্রকাশিত: ৯ মার্চ ২০২৩  

 



বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ এ পর্যন্ত বিশে^র ১৩টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। মাহাতো নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর কুড়মালি ভাষায় ভাষণটি অনুবাদ করা হয়েছে, যা নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভাষায় প্রথম অনুবাদ। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কি ছিল এই ভাষণে, কীইবা তাৎপর্য!

 

 

আমরা জানি জয়বাংলা দৃপ্তকন্ঠে উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ এ ৭ই মার্চের ভাষণ শেষ করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বজ্রনির্ঘোষে  লক্ষকন্ঠে বাঙালি গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রত্যয়ে। আজ এই উত্তাল মার্চের ইতিহাসের ধারাজলে সিক্ত হয়ে জানতে ইচ্ছে হয় ১৯৭৫ এ মৃত্যুর সময়, ধানমন্ডির বাড়ির সিঁড়িতে নিথর হওয়ার আগেও কি নিভৃতে বলেছিলেন জয়বাংলা। হয়তো, কেননা বাংলার জয় ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন রচনার দিন ৭ মার্চ ১৯৭১। 

 

 

আমাদের জাতীয় ইতিহাসে, এমনকি বিশ্বের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিন। বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যান বা সে সময়ের রেসকোর্স ময়দানে বিকেল ৩.২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরের লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে বজ্রকন্ঠে একটি বক্তৃতা করেন। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার ওই ভাষণটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র হিসেবে আজ সবাই এক বাক্যে মেনে নিয়েছে। তিনি সেদিন ভাষণটি দিয়েছিলেন মাত্র ১৯ মিনিটে।

 

 

ওই ভাষণের বিষয়, শব্দ নির্বাচন, ভাষাভঙ্গী সবকিছু মিলিয়ে বাক প্রক্ষেপণের পরিচর্যাটি ছিল যেন-বা বাঙালির মুক্তির কবিতা। ওই দিন ভাষণ দেয়ার সময় তাঁর দেহভঙ্গিমাও ভাষা প্রয়োগের আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার না করলে প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন কঠিন। মার্কিন সাময়িকী ‘নিউজ উইক’- ১৯৭১ সনের ৫ এপ্রিল সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে উল্লেখ করে।

 

 

ওই সময় তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর এই কালজয়ী ভাষণকে একটি অমর কবিতার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে । দেশে-বিদেশে গণযোগাযোগের উচ্চতর পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য এ ভাষণ বিশেষভাবে পাঠ্য। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের উপর অনেক গবেষণা হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হবে। এ ভাষণে মোট ১১০৭টি শব্দ আছে।

 

 

এতে কোন রকম অর্থহীন বিরতি অর্থাৎ এ্যাঁ, আঁ , ইয়ে বা ইসে জাতীয় ধ্বনি নেই। তিনি প্রতি মিনিটে প্রায় ৫৮ থেকে ৬০টি শব্দ উচ্চারণ করেছেন । মনে রাখতে হবে, এটি কোনও লিখিত বক্তৃতা ছিল না। এমনকি এর জন্য তিনি কোন নোট বা সূত্রও ব্যবহার করেননি। কোন পূর্ব প্রস্তুতিও নিতে হয়নি বা নেননি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার মুখ থেকে সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের আকাক্সক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে। ১১০৭টি শব্দে গাঁথা এই কবিতার মত ভাষণটি তিনি মাত্র ১৯ মিনিটের মধ্যে জনগণের সামনে উপস্থিত করেছিলেন। 

 

 

৭ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবন তথা নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত বিশ্বমানবের মুক্তি সংগ্রামের দিক নির্দেশনা। ১৯৪৭ সনে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের নির্দেশে দুটি দেশের সৃষ্টি হয়। ভারত ও পাকিস্তান। আমরা বর্তমান বাংলাদেশিরা পাকিস্তানের  পূর্ব অংশ হিসেবে তথাকথিত স্বাধীনতা পাই। আমাদের পরিচয় তখনকার ইতিহাসে পূর্ব পাকিস্তানি নাগরিক।

 

 

তখন থেকেই আমরা পাকিস্তানি শোষক শ্রেণীর অধীনে আরোপিত বৈষম্যের শিকার। বাঙালি ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে নিজের স্বাজাত্য পরিচয় লাভ করে। সর্ব প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। ৬ দফার পক্ষে জনমত সংগঠিত করেন। দিনে দিনে আন্দোলন জোরদার হয়।

 

 

সমগ্র দেশের আনাচ কানাচ ঘুরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করেন স্বয়ং শেখ মুজিব। ১৯৬৯ সনে শুরু হয় প্রবল গণঅভ্যূত্থান। এশিয়ার লৌহ মানবরূপে পরিচিত জেনারেল  আইয়ূব খানকে বিদায় নিতে হয় এই গণঅভ্যূত্থানের ফলে।

 

 

জাতির জনক, স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু মুক্ত স্বদেশ গড়ার পরিকল্পনা তৈরি করেন ১৯৬৬ সনে। ইতিহাসে তা ৬ দফা নামে বিখ্যাত। আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে শেখ মুজিব ছয় দফা প্রণয়ন করেন। সমগ্র জাতির সমর্থন নিয়ে ছয় দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সনে নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ইয়াহিয়া সরকার বাঙালির স্বাধিকারের দাবী প্রত্যাখ্যান করে।

 

 

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ জাতির জনকের নেতৃত্বে শুরু করে অসহযোগ আন্দোলন। মার্চ মাসের ১ তারিখে জেনারেল ইয়াহিয়ার সরকার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় পরবর্তীকালে অনুষ্ঠিত গণহত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাক সরকার।

 

 

গণহত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতির সময় দরকার ছিল পাক হানাদার বাহিনীর। পুরো দেশ থমথমে, কেউ জানে না কী হতে যাচ্ছে ! বিভিন্ন গুজব, আলোচনা, প্রত্যাশা সব মিলিয়ে দেশবাসীর আন্দোলন কোন পথে অগ্রসর হবে তার কোন দিশা পাচ্ছিল না। এমন অবস্থায় জাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্যই বঙ্গবন্ধু সেদিন এই ভাষণ দিতে রমনার সবুজ মাঠে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর ভরাট কন্ঠে লক্ষ জনতা কান পেতে শুনেছিল “ভাইয়েরা আমার... 

 

 

যদিও মার্চের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল। তাই ৭ মার্চের এই ভাষণ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ তাৎপর্যবাহী। এককথায় ছিল বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তির মন্ত্র। খুব অল্প কথায়, ছোট ছোট বাক্যে তিনি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বর্ননা করেন।

 

 

পাকিস্তানি শোষক-শাসকদের শত্রুতামূলক আচরণের বিবরণ দেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাঙালির শ্রম-ঘামে অর্জিত পয়সায় কেনা অস্ত্র দিয়ে কেন দেশের সাধারণ নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করে হচ্ছে ? ন্যায্য অধিকার দাবী করা কোন অন্যায় অপরাধ নয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা তা কানে তোলেনি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি চিরতরে স্তব্ধ করা। 

 

 

রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থনের কথা বিবেচনায় রেখে তাঁকে খুব সতর্কভাবে জনসভায় কথা বলতে হয়েছে। শুধু তাই নয় ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক, মুটে মজুর সমস্ত দেশবাসীর দাবির চাপ ছিল, রাজনীতির ভাষায়  একটিমাত্র দাবীতে পরিণত হয়েছিল; স্বাধীনতার দাবী।  বহুমুখী চাপের মোকাবেলা করে জনসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁকে ভাবতে হয়েছে অনেক দিক।

 

 

আন্তর্জাতিক মহল অপেক্ষায় ছিল মুজিব কী করেন তা দেখতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বসে ছিল রেসকোর্স ময়দানে আক্রমন করার জন্য। অন্যদিকে জনতার দাবী- আজ, এখানেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হবে। এমন পারিস্থিতিতে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে বহুমুখী চাপ সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে তিনি বক্তৃতা করলেন। কোনও পক্ষই হতাশ হল না।

 

 

তিনি এমন কুশলতায় সব শব্দ নির্বাচন করলেন যাতে সব পক্ষই সন্তুষ্ট হল। পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা বা জনসভা আক্রমণ করার মত অজুহাত পেল না। বিশ্ববাসী দেখল একজন জননেতা একটি বিশাল জনসভায় ভাষণ দিলেন। এতে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কেউ কোন অসুবিধা বা সমস্যার সূত্র তার ভাষণে খুঁজে পেল না।

 

 

অন্য কথায় জনগণ তার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ খুব পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারল। দেশবাসী বুঝে নিল আগামিতে কী পরিস্থিতি হবে এবং কিভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে। এই জনসভায় তিনি  রাষ্ট্রনায়োকোচিতভাবে  নির্দেশ জারি করেন দেশবাসী এবং সরকারি কর্মচারিদের উদ্দেশ্যে।

 

 

সারা দেশের মানুষ তাঁর নির্দেশ মত খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়। তাঁর নির্দেশ দেশের মানুষের মুক্তির পথের দিশা তৈরি করে। সুনির্বাচিত, সংক্ষিপ্ত শব্দ ব্যবহার করে তিনি শাসকদের সাবধান বাণী শোনান। অন্যদিকে দেশের জনগন সেই সব শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করে তাদের করণীয় সম্পর্কে বুঝতে পারে।

 

 

সবদিক বিবেচনা করে দেখা যায় এই ভাষণ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ও জনগনের মধ্যে আন্তরিক এবং অকৃত্রিম অভূতপূর্ব যোগসূত্র স্থাপন করে। যার জন্য আলাদাভাবে ভিন্ন কোনও ব্যাখ্যার দরকার ছিল না, হয়নি। এ জন্যে বাঙালির কোনই অসুবিধা হয়নি তাঁর ভাষণের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে নিতে।

 

 

তিনি বলেছেন “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।” এরপর মাত্র দুটো শব্দ উচ্চারণ করেন‘জয়বাংলা’। কেবল ছোট দুখানি শব্দ হলেও, ওই দুটো শব্দের ক্ষমতা ছিল অকল্পনীয় শক্তিশালী। কেননা ওই জয়ধ্বনি ছিল মায়ের ভাষায় প্রাণের আকুতি ভরা উচ্চারণ। বাঙালি বুঝেছিল এবং বিশ্বাস করেছিল মুক্তি আসবে। তার জন্য যুদ্ধে নামতে হবে আর জয় তাদের অবশ্যই হবে। 

 

 

ভবিষ্যতে কী হতে পারে তিনি ইঙ্গিতে দেশবাসীকে আগাম জানিয়ে দেন যখন তিনি দৃপ্ত, দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলেন, “ আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা তা বন্ধ করে দিবে। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” বাঙালি কিন্তু ঠিকই বুঝে নিয়েছিল যে, এটিই তাঁর হুকুম, দেশ স্বাধীন করার জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার আহবান।

 

 

তিনি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন নাÑ তারপরও কিন্তু তিনিই ছিলেন নেতা হয়ে, দিক নির্দেশক হয়ে। নয়মাস তিনি পাকিস্তানি কারাগারে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন। প্রতিমুহুর্তে তাঁকে মৃত্যুভয় দেখানো হত। কবর খুঁড়ে বলা হত এ কবর তার জন্যই। তবুও তিনি ভেঙ্গে পড়েননি, আত্মসমর্পণ করেননি ভয়ের সঙ্গে, আপোষ করেননি লোভের সাথে।

 

 

প্রকৃত নেতার মত একটি দেশের প্রতীকের মত সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করেছেন বীরের মত। আমাদের পক্ষে আজকের দিনে কল্পনা করা কঠিন একটি মানুষের মনের জোর কত শক্ত হলে দিনরাত মৃত্যুর মাঝে বাস করতে পারে। যে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েনি, কোনও লোভের কাছে আত্মবিকিয়ে দেয়নিÑ সেই তো হবে দেশের নেতা,দশের নেতা, জাতির নেতা, জাতির পিতা। 

 

 

নিরস্ত্র অসামরিক জনগন কিভাবে সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করবে, সেই চিন্তাও এই জননায়কের ভাষণে খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, “ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আমরা ভাতে মারব. পানিতে মারব। তোমরা আমাদের ভাই তোমরা ব্যারাকে থাকো- কেউ তোমাদের কিচ্ছু বলবে না। ... তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” আসলে বাঙালি তার অবিসংবাদিত  নেতার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে দেশরক্ষায় এগিয়ে  এসেছে।

 

 

পত্রপত্রিকার পাতায় ছাপা হত কোথাও কাঠের তৈরি নকল বন্দুক, কোথাও বাঁশের লাঠি ইত্যাদি হাতে যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী সামরিক কৌশলের মহড়া দিচ্ছে। সুশিক্ষিত আধুনিক সামরিক বাহিনীর তুলনায় এসব  ছিল ছেলেখেলা মাত্র। অনেকটা অভিনয়ের মত, সামনে আসলে কী ঘটবে, কতগুন ধ্বংস ক্ষমতা নিয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হবে, তা কেউ কল্পনা করতে পারেনি। এইসব মহড়া ছিল নেহায়েত মনোবল সৃষ্টি এবং ভবিষ্যত প্রয়োজনের সরল উপায় খোঁজার চেষ্টা মাত্র। 

 

 

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস এই জননন্দিত জননায়ক পাকিস্তানি শাসকদের কারাগারে বন্দী ছিলেন। দেশের মুক্তি পাগল মানুষের মাঝে ছিলেন না। কিন্তু তারপরও তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে, জনগণ ও প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার সবসময়ের ছায়াহীন সঙ্গী হয়ে। সশরীরে না থাকলেও তিনি ছিলেন বাঙালির অন্তরে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণস্পন্দনে।

 

 

ক্যাম্পে ক্যাম্পে, বধ্যভূমিতে প্রত্যেকটি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে শক্তি হয়ে, প্রেরণা হয়ে মানুষের মনেপ্রাণে- বিশ্বাসে। এই ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল মুক্তির প্রেরণার অমিয় শক্তির এক-একটি বুলেট, শাণিত বেয়নেট, গ্রেনেড। 

 

 

গণআন্দোলনের সার্থক ভাবসূত্র প্রয়োগ করে ৪৫ বছর আগে শেখ মুজিব মুখে মুখে এই ভাষণ রচনা করেন। উপস্থিত জনতার সামনে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন একটি বক্তৃতা দেওয়ার কথা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। উইনস্টন চার্চিল অথবা মার্টিন লুথার কিং তাঁদের ঐতিহাসিক ভাষণের সাথে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তুলনা করেছেন গবেষকগণ।

 

 

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে সারা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা এই ৭ মার্চের ভাষণ। দৃপ্ত, জড়তাহীন বজ্রকন্ঠে উচ্চারিত এরকম ভাষণের তুলনা দ্বিতীয়টি এই পৃথিবীতে বিরল। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর ১ নম্বর শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। 

 

 

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু সেদিন যে বিষয়টি সবচেয়ে বিচক্ষণতার সাথে বিবেচনা করেছিলেন তা হল, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এবং বিশ্ববাসীর সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি। এ সবই হারাতে হত যদি তিনি সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন সেদিনের রেসকোর্স ময়দানের জনসভায়। তাই তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুনির্বাচিত গূঢ়ার্থবোধক শব্দে ইঙ্গিতের মাধ্যমে জনগনের কাক্সিক্ষত ঘোষণাটি উচ্চারন করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম ! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। 

 

 

শেষ পর্যন্ত ৭ মার্চের ভাষণের ফল কি হল ? তিনি এদিনের ভাষণে বলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবÑ তবুও এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।” এ কথার মানেই হচ্ছে ৭ মার্চ না হলে আমরা প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পেতাম না। সুস্পষ্ট ইঙ্গিত না পেলে আমরা মানসিক প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হতাম। মনের শক্তি ছাড়া শুধু শারিরীক ও অস্ত্রের শক্তি দিয়ে জয়ী হওয়া যায় না।

 

 

তাই আজ আমরা স্বাধীন আর পাকিস্তানিরা বৃহৎ সামরিক শক্তি নিয়েও আমাদের কাছে সেদিন পরাজিত হয়। তাই আজ আমাদের একটি নিজস্ব ভূখন্ড আছে, আছে পতাকা, রয়েছে নিজেদের মনের মত জাতীয় সঙ্গীত। সারা বিশ্ব আজ স্বীকার করে নিয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ জয়ের একমাত্র এবং একমাত্র মন্ত্র, জয়ের অমোঘ অস্ত্র, নিরন্তর যুদ্ধ বা সংগ্রামের,প্রেরণার অফুরন্ত কালজয়ী ভান্ডার।  

 

 

শেষ কথাটি হচ্ছে শেখ মুজিব না হলে বাংলাদেশ হত না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্থপতি। দেশকে ‘সোনার বাংলা’য় রূপান্তরিত করার স্বপ্ন দেখেছেন। আমাদেরও স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাঁর সেই স্বপ্নদর্শন অসম্পূর্ণই রয়ে গেল মানুষ নামের ঘাতকের নির্মমতায়।

 

 

দেশের স্বাধীনতার জন্য যে মৃত্যু ছিল তার আরাধ্য - তা এলো অবশেষে তাঁর নিজ বাসগৃহে। আসলে মহামানবের কোনদিন মৃত্যু হয় না। শেখ মুজিবও তাই অমর সমগ্র বিশ্বজগতে, ইতিহাসে, স্বধীনতাকামী জনতার অন্তরে, সংগ্রামে, আন্দোলনে, আকাক্সক্ষায়, বিশ্বাসে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশে,বাঙালির হৃদয়ে।  এন.হুসেইন/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর