মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৭   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

হটস্পট না’গঞ্জে বাড়ছে উপসর্গহীন রোগী

ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২০  

করোনার জন্য হটস্পট নারায়ণগঞ্জে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। একই সাথে বাড়ছে উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যাও। শহরে অন্তত ২০ শতাংশ কোভিড পজেটিভের শরীরে রোগের কোন উপসর্গ নেই। একেবারে স্বাভাবিক অবস্থায় তারা কাজকর্ম করছেন।

 

করোনা আক্রান্ত এসব রোগীর কোন উপসর্গ না থাকায় কোন সতর্কতাও নেই। আর উপসর্গহীন এসব আক্রান্তরাই দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণে ভূমিকা রাখছেন উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ২০ শতাংশ রোগীই দিনে দিনে নারায়ণগঞ্জকে হটস্পটে পরিণত করছেন।

 

গত ১৩ দিনে নারায়ণগঞ্জে ১৪১৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। সতর্ক না হলে আগামী ১২ দিনে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকে তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে গত চব্বিশ ঘন্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন বাষট্টি জন। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪ শত ৭৫ জন।

 

করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে গত একদিনে নতুন কারো মৃত্যু হয়নি। আজ পর্যন্ত জেলায় মৃত্যু হয়েছে মোট উনষাট জনের। গত চব্বিশ ঘন্টায় সুস্থ হয়েছেন আরো ৮১ জন । এ নিয়ে আক্রান্তদের মধ্যে মোট সুস্থ হয়ে উঠেছেন ২ শত ৭৯ জন। জেলায় এ পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৫ হাজার ৭ শত ৪৫ জনের। গত চব্বিশ ঘন্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৩ শত ৭৪ জনের।

 

নতুন আক্রান্ত হওয়াদের মধ্যে একুশ জন রুপগঞ্জ উপজেলার, উনিশ জন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার, আট জন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার, দশ জন সোনারগাঁ উপজেলার, তিন জন আড়াইহাজার উপজেলার, এবং এক জন বন্দর উপজেলার বাসিন্দা। নারায়ণগঞ্জে আইএসপিআর ঘোষিত লকডাউন চলছে ৮ এপ্রিল থেকে।


বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ইতোমধ্যে নয় দফা চরিত্র পাল্টিয়েছে। একেক বার একেক ধরনের আক্রমণ করছে এই ভাইরাস। ইতোমধ্যে ব্যাপক হারে ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটেছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে কোন উপসর্গ ছাড়াই শরীরে প্রাণঘাতি এই ভাইরাস বাসা বাঁধছে।

 

অনেক করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছেন তাদের অন্তত ২০ শতাংশেরই শরীরে জ্বর সর্দি কাশির মতো কোন উপসর্গ নেই। যা দেশের সার্বিক করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে বলে শংকা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, ব্যাপকহারে নমুনা পরীক্ষা ছাড়া উপসর্গহীন আক্রান্তদের শনাক্ত করার অন্য কোন পথ নেই। আর ঘরে থাকা ছাড়া এদের সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচানোরও বিকল্প নেই। 


নারায়ণগঞ্জে একটি প্রতিষ্ঠানে করোনা নমুনা পরীক্ষা করা হলেও তা খুব একটা সহজলভ্য নয়। করোনা উপসর্গ থাকা, করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা, বিদেশ ফেরত এবং তাদের সংস্পর্শে আসাসহ বেশ কিছু ক্যাটাগরি নিশ্চিত হওয়ার পরই করোনা নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

 

একজন সাধারণ মানুষ নিজের সন্তুষ্টির জন্য করোনা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ এখনো নেই। লকডাউন করা ভবনগুলোর সব মানুষেরই করোনা নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। সীমিত এই করোনা পরীক্ষার মাঝেও দীর্ঘ জট লেগে আছে। 


নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেছেন, উপসর্গহীন রোগীই সামাজিক সংক্রমণের জন্য বড় হুমকি। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ ভয়াবহ রকমের ছোঁয়াছে এবং প্রাণঘাতি এক ভাইরাস। অথচ দেশে অসংখ্য করোনা আক্রান্ত মানুষ কোন ধরনের উপসর্গ ছাড়াই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা হাটে মাঠে ঘুরছেন। তাদের সংস্পর্শে যত মানুষ আসছেন প্রায় সবাই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন বা ঝুঁকিতে পড়ছেন।


পরীক্ষার পর শনাক্ত হয়েছেন এমন রোগীদের আইসোলেশনে নেয়া হলেও পরীক্ষা হয়নি উপসর্গহীন রোগীরা কোন কিছু মানছেন না। হাটে মাঠে ভিড় করা মানুষগুলোর মধ্যে কে করোনায় আক্রান্ত বা কে আক্রান্ত নন সেটি নিশ্চিত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। এই রোগ শনাক্তের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নমুনা পরীক্ষা। অথচ সেটিই অবারিত নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন- নিরবে যারা করোনায় আক্রান্ত হয়ে গেছেন তারাই এই ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।


অপর একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, দেশে দিনে দিনে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঘটনাও এজন্য বাড়ছে। তিনি বলেন, উপসর্গ আছে এমন একজন রোগী নিজে যেমন সতর্ক থাকেন তেমনি তার সম্পর্কে ধারে কাছের মানুষরাও সতর্ক থাকছেন। কিন্তু যার উপসর্গ নেই তিনি যেমন সতর্ক হচ্ছেন না তেমনি তার ধারে কাছের মানুষগুলোও সতর্ক হচ্ছেন না।

 

অথচ তিনি মানুষে মানুষে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাচ্ছেন। এর থেকে নিস্তার পেতে মানুষকে ঘরে থাকার যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে তা কড়াকড়িভাবে পালন না করায় সমাজে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে বলেও বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।


ইতালির অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে। ওখানকার এক সমীক্ষায়ও বলা হয় যে ইতালিতে ৫০-৭৫ শতাংশ করোনা সংক্রমণ ঘটেছে উপসর্গহীন রোগীর মাধ্যমে।


ভারতের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) তাদের সমীক্ষায় বলেছে, উপসর্গহীন বা হালকা লক্ষণযুক্ত রোগীর মাধ্যমে ৮০ শতাংশ সংক্রমণের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে এ ধরনের কোন সমীক্ষা বা গবেষণা পরিচালিত না হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ রোগী অজ্ঞাত উৎস থেকে সংক্রমিত হয়েছেন।


উপসর্গহীন রোগীর হার উদ্বেগজনক মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অনেকেই এদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। সঠিক কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও ল্যাবে যেসব নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে তার মধ্যে উপসর্গ নেই এমন বহু মানুষেরই করোনা পজেটিভ পাওয়া যাচ্ছে।


লক্ষণহীন রোগীরাই সংক্রমণের ক্ষেত্রে বড় হুমকি উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ধরনের সংক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ঘরে থাকার কোন বিকল্প নেই। বিশেষ প্রয়োজনে ঘরের বের হলেও স্বাস্থ্য বিধি পুরোপুরি অনুসরণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। 

এই বিভাগের আরো খবর