শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর খসড়ায় যা রয়েছে

প্রকাশিত: ৭ আগস্ট ২০১৮  

শিমুল মোহাম্মদ (যুগের চিন্তা ২৪): নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

 

খসড়া আইনটিতে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার মাধ্যমে গুরুতর আহত করলে বা প্রাণহানি ঘটানো হলে চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে অর্থদন্ড কি পরিমান হবে সে বিষয়ে খসড়ায় কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

 

সোমবার (৬ আগষ্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মাধ্যমে গুরুতর আহত বা প্রাণহানি ঘটালে আগে শাস্তি ছিল ৭ বছরের জেল। পরে সেটা কমিয়ে ৩ বছর করা হয়। এখন সেটা বাড়িয়ে ৫ বছর করা হয়েছে।

 

তবে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মধ্যমে মৃত্যু হলে এবং তদন্তে সেটা ইচ্ছাকৃত প্রমাণিত হলে দন্ডবিধি ৩০২ ধারা অনুযায়ী তার বিচার হবে। এটার শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড।

মন্ত্রিপরিষদ সূত্রে জানা যায়, আইনটিতে দূর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারকে সহায়তা দিতে একটি তহবিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

 

আইনটির খসড়া মতে, নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে, ঝুকিপূর্ণ ওভারটেকিং ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার মাধ্যমে দূর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধন হলে অনধিক তিন বছর কারাদন্ড বা অর্থদন্ড অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

 

তাছাড়াও বলা হয়েছে এমন অপরাধ সংগঠিত করতে প্ররোচনাকারী ও সহায়তাকারীকেও সমপরিমান শাস্তি ভোগ করতে হবে।

 

কোন ব্যক্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত মোটরযান চালাতে পারবেন না বিধান রেখে আইন অমান্যের শাস্তি  হিসেবে ছয় মাসের কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অপেশাদার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স ১৮ ও পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বয়স ন্যূনতম ২১ বছর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়াও বলা হয়েছে চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্তত অষ্টম শ্রেণি বা তার সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

 

ভূঁয়া লাইসেন্স ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শাস্তি হিসেবে অনধিক দুই বছর তবে অন্যূন ছয় মাসের কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচলক্ষ টাকা তবে অন্যূন ১ লক্ষ টাকা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

চালকের পাশাপাশি কন্ডাক্টরদের লাইসেন্স রাখার বিধান করে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি কন্ডাক্টর লাইসেন্স ব্যতীত কোন গণপরিবহনে কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না এই আইন অমান্যের শাস্তি হিসেবে অনধিক এক মাসের কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়াও তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী লিখিত চুক্তি ও নিয়োগ পত্র প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।

 

ফিটনেস বিহীন গাড়ি চালানো যাবে না বিধান করে বলা হয়েছে আইনের ব্যত্যয়ে শাস্তি হিসেবে অনধিক ছয় মাসের কারাদন্ড অনধিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে হবে।  

 

তাছাড়াও আইনটিতে গণপরিবহনের আসনসংখ্যা ও ভাড়া নির্ধারনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে কোন গণপরিবহন সহজে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন ব্যতীত যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। এবং পুন:নির্ধরিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি বা আদায় করা যাবে না। এর শাস্তি হিসেবে অনধিক ১ মাসের কারাদন্ড অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

 

মিটার চালিত কন্ট্রাক্ট ক্যারিজে মিটারে প্রদর্শিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে শাস্তি হিসেবে অনধিক ছয় মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

 

তাছাড়াও আইনে ট্রাফিক আইন সংকেত অমান্য করার জন্য চালকদের পাশাপাশি পথচারীদের শাস্তির বিধান রাখা হয়েরেছ। বলা হয়েছে সড়ক ব্যবহারকারীকে নির্দিষ্ট জেব্রা ক্রসিং ফুটওভার ব্রিজ আন্ডারপাস ও অনুরুপ সুবিধা ব্যবহারে বাধ্য থাকতে হবে। অন্যথায় এক মাসের কারাদন্ড অনধিক দশ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে হবে।

 

ধারা ৪৪ এর (২) এ বলা হয়েছে বেপরোয়াভাবে মোটরযান চালানো যাবেনা এবং (৩) উপধারায় বিপজ্জনক ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনের পরিপন্থি কাজের জন্য তিন মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়াও আইনে নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকা ব্যতীত মোটরযান থামানো বা থামানোর অনুরোধ করা যাবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

 

৪৯ ধারায় যানবাহনের সাধারণ নির্দেশাবলীর প্রথমাংশে নেশা জাতীয় বস্তু গ্রহণ করে কোন চালক মোটর যান চালাতে পারবেন না এবং কোন কন্ডাক্টর বা চালক মোটরযানে অবস্থান করতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তাছাড়াও বলা হয়েছে চালক কোন অবস্থাতে কন্ডাক্টর বা কোন শ্রমিককে মোটরযান চালনার দায়িত্ব দিতে পারবেন না বলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে আইনটিতে।

 

উল্টোপথে কোন মোটরযান চালানো যাবে না  ও চালক ব্যতীত মোটর সাইকেলে একাধিক সহযাত্রী বহন করা যাবে না ও চালক এবং যাত্রীকে হেলমেট ব্যবহার করতে হবে বলে নির্দেশ দেয়া হয়েছে খসড়া আইনটিতে।

 

চলন্ত অবস্থায় কোনভাবেই যাত্রী উঠানো বা নামানো যাবে না, প্রতিবন্দী যাত্রীদের জন্য গণপরিবহনে অনুকূল সুযোগ সুবিধা রাখতে হবে, ছাদে কোন প্রকার যাত্রী, পণ্য বা মালামাল বহন করা যাবে না, সড়কের ফুটপাথে কোন প্রকার মটরযান চলাচল করতে পারবে না এমন সব বিধান রেখে এই সাধারণ নির্দেশাবলীর ব্যক্তয় ঘটলে আইন অনুযায়ী অনধিক তিন মাসের কারাদন্ড অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয়দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।  

 

ধারার দ্বিতীয় অংশে মোটরযান চালনারত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহাওে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

চালকের সিটবেল্ট বাধা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি যাত্রীদেও উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে কোন যাত্রী চালকের মনসংযোগ ব্যাঘাত ঘটে এমন আচরণ করতে পারবে না। পারবেন না মহিলা শিশু প্রতিবন্দী ও বায়োজেষ্ঠ যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে।

 

কোন চালক কন্ডাক্টর বা পরিবহন সংশ্লিষ্ঠ কেউ যাত্রীদের সঙ্গে কোন প্রকার দূর্ব্যবহার বা অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে পারবে না বিধার রেখে এর ব্যক্তয়ে অনধিক ১ মাসের কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

 

আইনের ৬২ ধারায় (১) উপধারায় দূর্ঘটনার ঘটনায় আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষার্থে গাড়ির চালক, হেলপার বা পরিবহন সংশিষ্ট কোন ব্যক্তিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। অন্যথায় শাস্তি হিসেবে অনধিক এক মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

 

তাছাড়াও আইনটিতে দুর্ঘটনার বিষয়ে দ্রুত তথ্য প্রদান ও তাৎক্ষনিক সহায়তা চাইতে বাংলাদেশ পুলিশকে দেশব্যাপী টোল ফ্রি নম্বর প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

 

রাজধানীর কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কে বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানী জুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে চূড়ান্ত অনুমোদন পেল আইনটি। দেড় বছর আগে খসড়াটি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা।

 

এই বিভাগের আরো খবর