সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

স্মার্টফোনের দাপটে জৌলুস হারাচ্ছে স্টুডিও ব্যবসা

আবু সুফিয়ান

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩  


# সময় বদলে যাওয়ায় কমছে স্টুডিও ল্যাবের সংখ্যা
 

একটা সময় ছিল যখন ছবি তোলার জন্য সবাই স্টুডিওতে যেতেন। স্টুডিওর তোলা সেই ছবি যেন শুধু ছবিই নয়। ফ্রেমে ফ্রেমে বাঁধানো স্মৃতির উপাখ্যান। পারিবারিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন আয়োজনে ছবি তুলে সেই ফ্রেম বন্দি করে রাখার স্মৃতি হাতছাড়া করতে চান না কেউ। আগে যেকোনো উৎসবে ছবি তোলার জন্য হিড়িক পড়ে যেত স্টুডিওতে।

 

স্টুডিও ফটোগ্রাফি

কিন্তু এখন সময়ের সাথে বদলেছে স্টুডিও ফটোগ্রাফি। সাদা কালো থেকে রঙিন যুগে প্রবেশ করেছে স্টুডিও ফটোগ্রাফি। আর ফিল্মের ক্যামেরার জায়গা নিয়েছে ডিএসএলআর। ধীরে ধীরে রূপান্তর ঘটেছে স্টুডিও ব্যবসায়। স্বামী স্ত্রী কিংবা বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের একই স্টাইলের যে ছবি তোলার দৃশ্য তা এখন আর চোখে পড়ে না।

 

 

স্টুডিওতে ছবি তোলার আগে সুন্দর কাপড়ে কত সাজগোজ। আর আয়নায় নিজেকে বারবার দেখা। স্টুডিওর এমন দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। ছবি কিংবা ভিডিও দুটিই এখন করছে হাতের স্মার্টফোন। এখন মানুষের হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে সব আচার-অনুষ্ঠান ধারণ করা হয় এই স্মার্টফোনে। আর এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়কার রমরমা স্টুডিও ব্যবসা।

 

 

নিজ হাতেই যখন স্টুডিও তখন আর কে যায় দূরের স্টুডিওতে। তাইতো এখন আর কোনো কিছুই বাদ যায় না স্মার্টফোনের সেলফি থেকে। প্রযুক্তির এই যুগে প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট ফোন মানেই এক একটি ডিএসএলার ক্যামেরা। আবার কারো হাতে দেখা যায় বিশাল লেন্সের ডিজিটাল ক্যামেরা।

 

 

নারায়ণগঞ্জের একটি স্টুডিওর কর্মচারী জানান, স্টুডিওতে এখন মানুষ আগের মত ছবি তুলতে আসেননা । কিন্তু বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে স্টুডিওতে আসেন। পাসপোর্ট বা ভিসার ছবি তোলার জন্য স্টুডিওতে আসেন। তাছাড়া বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানিক কাজে ছবি তুলতে মানুষ স্টুডিওতে আসেন।

 

 

নারায়ণগঞ্জের স্টুডিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূলত ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের হাতে হাতে ক্যামেরা চলে আসায় এখন আর ছবি তোলার জন্য সচরাচর স্টুডিওতে আসেননা কেউ। আবার খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া ছবি প্রিন্টও করান না কেউ। তারা জানান, সাধারণ কাজের জন্য যেসব ছবি লাগে তা বিভিন্ন ফটোকপি-প্রিন্টের দোকান থেকে কম দামের কাগজে করিয়ে নেওয়া যায়।

 



স্টুডিও জোনাকিতে ছবি তুলতে আসা স্কুল শিক্ষার্থী আরিয়ান বলেন, স্কুলের কাজে ছবি তুলতে এসেছি। স্টুডিওতে না এসে এই ছবি ফোন দিয়ে তুললে হয় না তাই এখানে এসেছি। শহরের স্টুডিও ফটোগ্রাফোতে ছবি তুলতে এসেছেন মো. রিয়াদ। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, একসময় সাদাকালো বক্স ক্যামেরায় ছবি তোলা হতো।

 

 

এরপর আসে পিনহোল, এসএলআর ও কমপ্যাক্ট ইত্যাদি ফিল্ম ক্যামেরা। ২০০০ সালের দিকে ছোট ডিজিটাল ক্যামেরা এলে তা ক্রমে মানুষের হাতে হাতে চলে যায়। এর মধ্য দিয়ে ফিল্মের পরিবর্তে কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়।

 

ডিএসএলআর ক্যামেরার যুগ

তারপর ডিএসএলআর ক্যামেরা এলে ছবি তোলার প্রক্রিয়া আধুনিক হয়। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে স্মার্টফোনের বিস্তারের ফলে। তাই স্টুডিওতে ছবি তোলার চাহিদা অনেক কমেছে।

 



এদিকে স্টুডিওর গ্রাহকসংখ্যা কমে যাওয়ায় লোকসানে পড়েছেন স্টুডিও মালিকরা। অনেকে স্টুডিওতে ফটোকপি ও প্রিন্টার মেশিন রেখেছেন। কেউ কেউ আবার অনলাইনের বিভিন্ন কাজও করে থাকেন।

 

 

সাদাকালো ছবির সময়ে বড় স্টুডিওগুলোতে রমরমা ব্যবসা ছিল। তখন এখানে অনেক কর্মী কাজ করতেন। আর এখন এই কর্মীর সংখ্য কোন কোন স্টুডিওতে দুই থেকে তিন জনে নেমে এসেছে।

 



বলা হয়ে থাকে আগে বিনোদনের জায়গা ছিল দুটি। ছবি তোলা আর সিনেমা দেখা। এখন সেই অবস্থা আর নেই। এখন দাপ্তরিক কাজের জন্য মানুষ স্টুডিওতে আসেন। স্টুডিও ব্যবসায়ীরা জানান, ভিসার কাজের জন্য অনেক দূতাবাস এখনো নির্দিষ্ট কালার পেপারে ছবি চায়।

 

 

এসব ক্ষেত্রে ছবি সাধারণ ইনজেক্ট পেপারে দিলে দূতাবাস তা গ্রহণ করে না। ফলে এ ধরনের কাজে মানুষ স্টুডিওতে আসেন। যাঁরা দীর্ঘদিন ছবি সংরক্ষণ করে রাখতে চান, তাঁরা আসল কালার পেপারে ছবি প্রিন্ট করিয়ে অ্যালবামে বা বাঁধাই করে রাখেন। বিয়ে, জন্মদিন, মডেলিং ইত্যাদি কাজে কম হলেও এখনো স্টুডিওর চাহিদা আছে।

 



স্টুডিও ফটো জুমে ছবি তুলতে আসা মো. সাকিব বলেন, স্মার্টফোনে হাজার হাজার ছবি তুলছেন যারা। তাদের প্রয়োজন পড়ছে না স্টুডিও বা ল্যাবে যাওয়ার। বাংলাদেশে একটা সময় সবাই বিভিন্ন স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তুলতেন।

 

আজ সবই অতীত

পরিবারের সঙ্গে তোলা সেসব ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য। স্টুডিও দেয়ালের সেসব দৃশ্যে শোভা পেতো ফুল লতা পাতায়। কিন্তু এখন সবই অতীত।

 



সাদা কালো ছবির সময় শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এখন কারো বাসায় আর বাঁধানো ছবি খুব একটা চোখে পড়ে না। সবাই মোবাইল কিংবা কম্পিউটারে আপলোড করে রাখেন। কিন্তু সেই ছবিতে যে আবেগ ছিল; এখনকার ছবির মধ্যে তা সত্যিই খুঁজে পাওয়া যায় না। এন.হুসেইন/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর