সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৩ ১৪২৬   ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

স্বপ্নপূরণের আরেক ধাপ : ডিজিটাল বার ভবনের প্রথমতলার ছাদ ঢালাই

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির ৮ তলা ডিজিটাল ভবন নির্মাণের কাজ আরেকধাপ এগোলো। মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) আটতলা ভবনের প্রথম তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এদিন সকালে ১ম তলার ছাদ ঢালাই কাজের উদ্বোধন করেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড.হাসান ফেরদৌস জুয়েল। দুপুরে ভবনের প্রথম তলার ছাদ ঢালাই উদ্বোধন উপলক্ষে মিলাদ ও মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন, সাবেক আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. আমিনুল ইসলাম, সাবেক নারী সাংসদ এড. হোসনে আরা বাবলী উপস্থিত ছিলেন। 

 

অনুষ্ঠানে আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড.হাসান ফেরদৌস জুয়েল বলেন, ডিজিটাল বার ভবন নির্মাণের কাজ করতে গিয়ে অনেক ঝড়ঝাপ্টা এসেছে। এভবন নির্মাণে সাংসদ শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। এজন্য তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। একাজের উদ্বোধন করতে আইনমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জে আসার আগে তাঁর কাছে বেনামে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছে এই ভবন তৈরির জন্য কোন প্ল্যান নাই। কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত তাকে নারায়ণগঞ্জে আনতে পেরেছিলাম। ষড়যন্ত্র রুখতে সার্কিট হাউজে মন্ত্রী অবস্থানকালে আমরা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন সেলিম ওসমান জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে অর্থ দেবেননা। কিন্তু তিনি গতবছরই ১ কোটি টাকা এই বারভবন নির্মাণের জন্য দিলেন। জাতীয় নির্বাচনের পর দিলেন আরো ৫০ লাখ টাকা। এই কয়েকদিন আগের আরো ৫০ লাখ টাকাসহ তিনি ইতিমধ্যে ২ কোটি টাকা এই বার ভবন নির্মাণের জন্য দিয়ে দিয়েছেন। 

সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল বলেন, এই বারভবনের কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে বারবার জেলা প্রশাসক, গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বিরক্ত করা হলো। জেলা ও দায়রা জজের আন্তরিক সহযোগিতা ও অন্য দপ্তরগুলোর সহযোগিতার কারণে বারভবনের কাজ ঠিকই এগিয়ে চলেছে। সাংসদ শামীম ওসমান বেশ কয়েকবার এসে এই বারভবনের কাজ দেখে গেছেন। বারভবন নির্মাণের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতের করিডোর ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, সাংসদ শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের সহযোগিতায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়ার মাধ্যমে সার্কিট হাউজের দেয়াল ঘেঁষে আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। ডিজিটাল এই বারভবন নির্মাণের জন্য আইনজীবী সমিতির ফান্ডের একটাকাও খরচ করা হয়নি। আমরা বলেছিলাম আইনজীবী সমিতির ফান্ড ১০ কোটি টাকা করে যাবো সেটিও পারবো ইনশাআল্লাহ। আইনজীবীরা সর্বোপরি সহযোগিতা করার জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু অনেকেই চেষ্টা করেছেন আইনজীবীদের স্বার্থ নষ্ট করার জন্য। বারভবন নির্মাণের জন্য নেপথ্যে থেকে কাজ করার জন্য নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্টিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল ও বিকেএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট (অর্থ) মো. মোরশেদ সারওয়ার সোহেলের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।   

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন,  মানুষের  কোন কর্ম কখন কি ইতিহাস তৈরি করতে পারে সেটি কেউই বলতে পারেনা। এখানকার আইনজীবীদের স্বপ্ন ছিলো একটি ডিজিটাল বার ভবন নির্মাণ করা। আমিও ভাবতে পারিনি কিন্তু এই আইনজীবী নেতারা সেটি করে দেখিয়েছেন। আমি ধন্যবাদ জানাই তাদের তারা কাজটি শেষ করতে পেরেছেন। আপনারা উন্নত আইনজীবী বলেই এমন ডিজিটাল বার ভবন করা সম্ভব হচ্ছে। আমি যতদূর পেরেছি চেষ্টা করেছি আপনাদের সহযোগিতা করার জন্য। 

অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ শাহ্ মো. জাকির হোসেন, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফয়সাল বিন আতিক, কাওছার আলম, পাবলিক প্রসিকিউটর এড.ওয়াজেদ আলী খোকন, জিপি এড মেরিনা বেগম, সিনিয়র আইনজীবী এড. মাসুদুর রউফ, এড. শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া, জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি এড. আলী আহম্মদ ভূঁইয়া, সহসভাপতি এড. বিদ্যুৎ কুমার সাহা, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক এড. স্বপন ভূঁইয়া, এপিপি এড.সুইটি ইয়াসমিন, এপিপি এড.জাসমিন আহমেদ, এড. সেলিনা ইয়াসমিন, এড.নুর জাহান বেগম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন । দোয়া অনুষ্ঠানে আইনজীবী সমিতির প্রয়াত সদস্যদের আত্মার মাগফেরাত ও সাংসদ শামীম ওসমান এবং সেলিম ওসমানের সুস্বাস্থ্য কামনা করে  মোনাজাত পরিচালনা করেন কোর্ট মসজিদের ইমাম মুফতি দেলোয়ার হোসেন সরকার। পরে সকলের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়।

 

ডিজিটাল বার ভবন নির্মাণের স্বপ্ন দেখা ও অগ্রগতি যেভাবে :

আইনজীবী  সমিতির বহুতল বিশিষ্ট বার ভবনের স্বপ্ন দেখা শুরু হয় ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর। তখন আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু। সেদিন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এমপি আইনজীবী সমিতির ভবনে এসে আইনজীবীদের দাবি অনুযায়ী দুই কোর্ট একসাথে নতুন কোর্ট প্রাঙ্গণে রাখার নীতিগত সিদ্ধান্তে কথা জানান। সেদিন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান আইনজীবীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে নতুন করে বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তখনকার বারের সভাপতি এড.আনিসুর রহমান দিপু বহুতল বিশিষ্ট নতুন বার ভবন নির্মাণে সাংসদ সেলিম ওসমানকে সহযোগিতা করার জন্য তৎসময়ে সংরক্ষিত আসনের এমপি এড.হোসনে আরা বাবলীকে আহবায়ক করে বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েলকে সদস্য সচিব করে এবং এড.খোকন সাহাকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়। প্রায়  দেড় বছরেরও বেশি সময় পর ২০১৮ সালে ২০ জুন আইনজীবী সমিতির বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দাখিলী দরখান্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ‘নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির’ পুরাতন জরাজীর্ন, ঝুকিপূর্ণ ভবনসহ নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি এবং নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের মাধ্যম হয়ে মন্ত্রী আনিসুল হক বরাবর আবেদন প্রেরণ করা হয়। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বতর্মান কমিটির সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল ও সাধারণ সম্পদক মোহসীন মিয়া বরাবর আইন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সৈয়দা কানিজ কামরুন নাহার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিচারপ্রার্থী  জনগণ  এবং আইনজীবীদের কথা বিবেচনা করে বারের পুরাতন জরার্জীণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও টিনশেডের স্থলে শুধুমাত্র আইনজীবী সমিতির নিজস্ব জায়গায় নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি প্রদান করা হয়। তবে জেলা জজ আদালতের  কোন জায়গায় কোনভাবেই কোন নির্মাণ কাজ করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়। এবং এই প্রজ্ঞাপনে সকলের জ্ঞাতার্থে নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ, আইন মন্ত্রীর একান্ত সচিব, সচিবের একান্ত সচিব বরাবরও প্রেরণ করা হয়।

 

গণপূর্ত অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলার ডিজিটাল জরীপের সূত্রে যায়,  জেলা ও দায়রা জজ আদালত তিনতলা ভবনের পূর্বদিকে আইনজীবী সমিতির চারতলা বিশিষ্ট ভবনসহ, টিনশেড ভবন, মুহুরী সমিতির ভবন ও মসজিদ সহ মোট জায়গার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে আইনজীবী সমিতির পুরাতন ভেঙে ফেলা চারতলা ভবন প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ জুড়ে। আর বাকি অংশে ছিলো টিনশেড, মসজিদের স্থাপনা। 

 

ডিজিটাল বার ভবনের উদ্বোধন ও অর্থায়ন :

২০১৮ সালের ২৩ সেপেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির অভিষেক ও নতুন ডিজিটাল বার ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ নতুন ডিজিটাল বার ভবন নির্মার্ণে অর্থে যোগানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয় ৫ কোটি টাকার। সকলের সামনেই কে কতো অর্থ সাহায্য দেবেন তাঁর মৌখিক সুরাহা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আমি সভাপতিকে (হাসান ফেরদৌস জুয়েল) জিজ্ঞাসা করেছিলাম বারভবন নির্মাণের জন্য কত টাকা লাগবে? তিনি বলছেনÑসবসাকুল্যে ৫ কোটি টাকা লাগবে। সেলিম ওসমান বলে গেছেন এই ডিজিটাল বার ভবন নির্মাণের জন্য ৩ কোটি পর্যন্ত (ইতিমধ্যে ২ কোটি টাকা দিয়েছেন) দিবেন। আমি (আইনমন্ত্রণালয় থেকে) শরীক হবো ১ কোটি টাকা। গোলাম দস্তগীর গাজী (বর্তমান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এবং নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ) আমাদের সাথে হাত মেলালে বাকি ১ কোটি টাকার যোগান নিশ্চিত হয়ে যায়। অনুষ্ঠানেই এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী তখন উঠে বলেন, আপনি (মন্ত্রী) যখন বলেছেন কথা রাখবো। ওই দিনই ভিত্তিপ্রস্তার স্থাপন করা হয় ডিজিটাল বার ভবনের। তবে ভিত্তিপ্রস্তরে অর্থায়নে সহযোগিতা করা গোলাম দস্তগীর গাজীর ছবি না দিয়ে এমপি শামীম ওসমানের ছবি থাকায় এতে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় আইনজীবীদের মধ্যে। তারা তখন বলেছিলো অন্যদের সাথে গোলাম দস্তগীর গাজীর ছবিও রাখাটা সমীচিন ছিলো। 

যা থাকছে আইনজীবী সমিতির ৮ তলা ডিজিটাল বার ভবনে :

প্রায় সাড়ে ১৮ শতাংশ জায়গার উপর আইনজীবী সমিতির ৮ তলা ভবনের ৮ হাজার স্কয়ারফিটের নতুন ভবনের নকশা তৈরি করা হয়। এতে দুটি লিফট এবং সিঁড়ির সুবিধা থাকবে। ভবনের নিচতলায় মুহুরী সমিতি, একটি মসজিদ এবং একটি ক্যান্টিনের জন্য জায়গা বরাদ্দ থাকবে।  দ্বিতীয় তলায় থাকবে সুরুজ আলী মিলনায়তন, ডাক্তারের চেম্বা। তৃতীয় তলায় ২৪২ জন (রেগুলার ১৪৯ জন) মহিলা আইনজীবীদের জন্য ১৫০০ স্কয়ার ফিটের কমন রুম এবং লাইব্রেরি থাকবে। পূর্বের ভেঙে ফেলা বার ভবনে আইনজীবীদের যেখানে বসার জন্য ছিলো ১৮০০ স্কয়ারফিট সেখানে নতুন তৈরি করা ভবনে থাকবে ৩৬০০ স্কয়ার ফিট জায়গা। চতুর্থ তলায় আইনজীবীদের জন্য ৬০০০ স্কয়ারফিটের হলরুম থাকবে। ৫ম তলা, ৬ষ্ঠ তলায় প্রায় ২০০টি চেম্বাররুম, ৭ম তলায় হলরুমের উপরে থাকবে ফটোকপি, টাইপসহ  লজিস্টিক কাজ করার ব্যবস্থা থাকবে। নিচ তলা পুরোপুরি সম্পন্ন করার জন্য শুরুতেই আনুমানিক ১ কোটি বা তারচেয়ে বেশি টাকা লাগবে বলে জানান আইনজীবী সমিতির নেতারা। তখন গেলো বছরেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ সেলিম ওসমান এই টাকাটি দেন।
 

এই বিভাগের আরো খবর