বুধবার   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ৭ ১৪২৬   ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সরস্বতীর  বীণা ও বাহন রহস্য

প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারি ২০২০  

সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে কিন্তু সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হল জলবতী অর্থাৎ নদী। পুরাণে বলা হয়েছে-দেবী সরস্বতী আদ্যা প্রকৃতির তৃতীয় অংশজাত। তিনি বাক্য, বৃদ্ধি, জ্ঞান, বিদ্যা প্রভৃতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী, যার কারণে এর প্রতীক হিসেবে সরস্বতীর হাতে শোভা পাচ্ছে বীণা। 

 

পুরাণে ও পুরাণোত্তর আধুনিককালে দেবী সরস্বতী বাক্য বা শব্দের অধিষ্ঠাত্রী বাগদেবী হিসেবে পরিচিতা। পরবর্তীকালে বৈদিক দেবী সরস্বতীর অন্য পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি কেবলমাত্র বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপেই সুপ্রতিষ্ঠাতা হয়েছেন। ঋগে¦দে সরস্বতীর সঙ্গে বিদ্যাধিষ্ঠাতৃত্বের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অথর্ববেদে এবং ব্রাহ্মণে সরস্বতী বাগ্দেবী, যে কারণে তার হাতে আমরা বীণা দেখতে পাই।

 

বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, তিনি বাক্পতিও। ইন্দ্রও বাক্পতি। বৃহস্পতি-পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সব জ্ঞানের ভাণ্ডার তো ব্রহ্মা-বিষ্ণু আর মহেশ্বরের। তাদেরই শক্তিতে সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ, ঋগমন্ত্র। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন ধরাতে। দিনে দিনে সরস্বতী তার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে কেবলমাত্র বিদ্যাদেবী অর্থাৎ জ্ঞান ও ললিতকলার দেবীতে পরিণত হলেন, যার কারণে তার হাতে বীণা।

 

পরমপুরুষের প্রথম অবতারের ইচ্ছাশক্তি, জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি। এই তিন -এর গুণাবতার হল বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও রুদ্র। ঋগে¦দে বাগ্দেবী ত্রয়ীমূর্তি। জ্ঞানময়ী রূপে সব জায়গাতেই তিনি আছেন। বিশ্বভুবনের প্রকাশ তারই জ্যোতিতে। যোগীর হৃদয়ে সেই আলোকবর্তিকা যখন জ্বলে ওঠে তখন জমাট বাধা অজ্ঞানতার রূপ অন্ধকার দূর হয়ে যায়। সে অবস্থায় সাধকের উপলব্ধি ঘটে অন্তরে, বাইরে সব জায়গাতেই আলো। এই জ্যোতির জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই প্রণব, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী বলেই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত্বগুণময়ী। জ্ঞানের পরিধি অসীম। অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক এই সরস্বতী, তাই তিনি বাগ্দেবী। তাই তার হাতে বীণা। 

 

নদীর তটে সাম গায়কেরা বেদমন্ত্র উচ্চারণে সাধনে নিমগ্ন হত। তাদেরই কণ্ঠে উদগীত সামসঙ্গীত শ্রুতি-সুখকর হত। তারই প্রতীক দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি-বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয়পূর্বক সাধনা করতেন ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবীর হাতে বীণা দেখা যায়। 

 

কাশ্মীরী পণ্ডিত কলহন বলেছেন, হাঁসের উপর বসা সরস্বতীর মূর্তি সচরাচর অনেক পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে দেবীর এই উভয়চর বাহনটি তিনি ব্রহ্মার শক্তি হিসেবে ব্রহ্মার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মা বা সরস্বতী দেবীর বাহনটি পাখি বিশেষ নয়। বেদে এবং উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব এই তিন শক্তির বাহন হয়েছে হংস বা সূর্য। তবে সিংহ ও মহিষ সরস্বতীর আদি বাহন ছিল যা জানা যায় বৈদিক যুগের বিভিন্ন সাক্ষ্য থেকে। পরবর্তীকালে দেবী দুর্গা সরস্বতী দেবীর কাছ থেকে সিংহ ও কার্তিক কেড়ে নিলেন ময়ূর, সিংহ ও ময়ূর ছেড়ে দিয়ে সরস্বতী দেবী ব্রহ্মার শক্তি ব্রাহ্মণী হিসেবে বাহনটিকে চিরস্থায়ী মর্যাদা দিলেন।

 

সরস্বতীর রূপ দু’টি-নদীরূপী সরস্বতী ও বিদ্যা দেবীরূপী সরস্বতী। নদীরূপী সরস্বতীর বুকে অসংখ্য হাঁস বিচরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। নদী বয়ে চলে। হাঁসগুলোও সে চলার সাথে তাল মেলায় অর্থাৎ উভয়ের গতি আছে। ত্রিচর এই হাঁস নিয়ে সরস্বতীর জলে, স্থলে, অনলে, অনিলে সব জায়গায় বিচরণ করতে পারেন বলে সরস্বতীর বাহন হচ্ছে হাঁস। 

 

খোলা আকাশে হাঁসের অবাধ বিচরণ। আকাশে হাঁসের গতি দ্রুত কিন্তু নিচ থেকে তাকালে মনে হয় নিশ্চল। এর অর্থ হল স্বরূপ লক্ষণ আর তটস্থ লক্ষণ। স্বরূপ লক্ষণ হল-নির্গুণ, নিরাকার, নির্বিশেষ, নিষ্ক্রিয়-নিরঞ্জন সচ্চিদানন্দস্বরূপ। তটস্থ লক্ষণ হল-সগুণ, সাকার, সবিশেষ, সক্রিয়-বিশ্ব জগতের কর্তা বা ঈশ্বর। 

 

হাঁস উক্ত দুটি গতির মধ্যে পরব্রহ্মের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়, সুতরাং সাকার ও নিরাকার, সগুণ ও নিগুণ স্বরূপের দুটি ভাবই বর্তমান। এই কারণে হাঁস দেবী সরস্বতীর বাহন।

 

হাঁস জল ও দুধের পার্থক্য বোঝে। অর্থাৎ জল ও দুধ মিশিয়ে দিলে হাঁস শুধু দুধ পান করে জলটুকু পড়ে থাকে। অর্থাৎ জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে হাঁসের এ স্বভাব অনেক তাৎপর্য বহন করে। সংসারে নিত্য ও অনিত্য দুটিই আছে। জ্ঞানীর উচিত নিত্য গ্রহণ করে অনিত্য ত্যাগ করা। হাঁসের এই স্বভাবের কারণে হাঁস সরস্বতীর বাহন।

 

হাঁসের জৈব গঠন লক্ষ্য করলে আমরা দেখিÑতার গায়ের পালক এমনভাবে তৈরি যে জলেতে চললেও গায়ে জল লাগে না। মানুষের এই সংসার জগতে বাঁচতে গেলে হাঁসের মত সংসারে থাকতে হবে কিন্তু সংসারের কোনো ময়লা লাগানো যাবে না।

 

তারাপদ আচার্য্য
লেখক : সাধারণ সম্পাদক-সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম
দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

এই বিভাগের আরো খবর