শুক্রবার   ২৯ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৭   ০৬ শাওয়াল ১৪৪১

সরকারি নির্দেশনা মানছে না নারায়ণগঞ্জের শিল্প-কারখানার মালিকরা

প্রকাশিত: ৭ এপ্রিল ২০২০  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় সরকার ঘরে থাকার নির্দেশ দিলেও মানছে না নারায়ণগঞ্জ জেলার শিল্প-কারখানার মালিক। একাধিক শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বেতন-ভাতার অজুহাতে কারখানাগুলোতে যোগদানের জন্য বাধ্য করা হচ্ছে শ্রমিকদেরও।

 

এদিকে গত এক সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ৬ জন। এছাড়া করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু খবর পাওয়া গেছে একাধিক। অন্যদিকে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮ জন। এর মধ্যে মঙ্গলবার একদিনে নতুন আক্রান্ত হয়েছে ১৫ জন।  প্রতিনিয়ত বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। 

 

তাই নারায়ণগঞ্জকে করোনাভাইরাসের ক্লাস্টার বলছে আইইডিসিআর। ইতোমধ্যেই নারায়ণগঞ্জের সদর ও বন্দর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। 

 

কিন্তু এতটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নারায়ণগঞ্জের একাধিক পোশাক কারখানা, হোসিয়ারিসহ শিল্প কারখানাগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বেতনভাতার দাবিতে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও লিংকরোডে মঙ্গলবারও মহাসড়ক ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। 

 

একজন শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছুটি দিলেও বেতন দেওয়া হয় নি। তাই আমাদের যেতে হচ্ছে। কিছু করার নেই। গরীবের  রোগবালাই থাকতে নেই। 

 

শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলায় পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ২ হাজার ৪৫৯টি। এর মধ্যে আরএমজিভুক্ত ৬৪২টি আর নন আরএমজিভুক্ত ১৭৫৮টিসহ আরও ৫৯টি কারখানা রয়েছে। এ সকল কারখানাগুলোতে কাজ করে ৭ লাখ ১ হাজার ৪০৪ জন শ্রমিক। এর মধ্যে পুরুষ ৪ লাখ ১ হাজার ৬০ জন ও নারী শ্রমিক রয়েছে ৩ লাখ ৩৪৪ জন।  

 

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ কারখানাই বন্ধ রাখা হলেও কিছু পোশাক কারখানাসহ নিটিং, সিমেন্ট, ঔষধ, আটা, বিস্কুটসহ বিভিন্ন ধরনের ৫০-৬০টি শিল্প কারখানা খোলা ছিল। 

 

এ  তথ্য নিশ্চিত করে শিল্প পুলিশ-৪ এর পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন জানান, পোশাক কারখানাগুলো তেমন খোলা নেই। যদি খোলা থাকে তাহলে শ্রমিকদেও বেতন পরিশোধের জন্য এ সকল কারখানা আজকে খোলা রাখা হয়েছে। কারণ অনেক কারখানা মাসের ৭ বা ৮ তারিখে বেতন দেয়। তবে খাবার, ঔষধের কারখানাগুলো খোলা রয়েছে। যেমন মেডিকেল সরঞ্জাম তৈরি প্রতিষ্ঠান জিএমআই, ঔষধ তৈরি প্রতিষ্ঠান এসিআই তারপর কিছু আটার মিল, কিছু বিস্কুটের ফ্যাক্টরি, সিমেন্টের কিছু ফ্যাক্টরি খোলা রয়েছে। 

 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আসলে যদি কোনো পোশাক কারখানা খোলা থাকে তাহলে তা আমাদের না জানিয়েই খোলা হয়েছে। আমাদের এলাকায় ২৪৫৯টি গার্মেন্টস রয়েছে। এর মধ্যে ২-৪টি গার্মেন্টস আমাদের জানিয়েছে তারা আজকে শ্রমিকদের  বেতন দিচ্ছে।  আমারও সেখানে আমাদের পুলিশ পাঠিয়েছি যাতে নিয়মানুযায়ী সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শ্রমিকদেও বেতন দেওয়া হয়। এ রকম যারাই আমাদের ফোন করছে, আমরা সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে দিচ্ছি। 

 

এদিকে, মঙ্গলবার সকালে কর্মস্থলে যেতে দেখা যায় অনেক শ্রমিককে। জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে অন্যতম গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ফকির গার্মেন্টস তাদের শ্রমিকদেও বেতন পরিশোধের জন্য গার্মেন্টসে যাওয়ার জন্য বলেছে।

 

ওই গার্মেন্টের শ্রমিক পারভীন বেগম বলেন, বেতন পরিশোধের জন্য আমাদের গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ ৭ তারিখ যেতে বলেছে। ঘরে আড়াই বছরের ছোট্ট ছেলে। যে রোগ ভয় লাগছে। “কিন্তু যাইতে তো হইবোই। বেতন দিলে বাজার কইরা নিয়া আসবো।” 

 

আরেক শ্রমিক রত্না বলেন, “জানি করোনাভাইরাস ধরতে পারে কিন্তু কিছু করার নেই। মাস শেষ ঘরে বাজার শেষ তাই যাওয়া লাগবো।”

 

ফকির গার্মেন্টস খোলা রাখার ব্যাপারে শিল্প পুলিশ-৪ এর পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঔষধ এবং খাবার ফ্যাক্টরিগুলো খোলা রাখার নির্দেশ রয়েছে।  অন্যান্য কোনো ধরনের শিল্প কারখানা খোলা রাখার নির্দেশ নেই। তবে যারা খোলা রাখছে তারা আমাদের না জানিয়েই খোলা রেখেছে। ফকির গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষও আজকে শ্রমিকদেও বেতন দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। 

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি, উকিলপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে পোশাক কারখানাসহ সকল ধরনের কারখানা বন্ধ থাকার নিষেধ থাকলেও ছোট ছোট কারখানা, হোসিয়ারিগুলো খোলা রেখেছে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ মালিকরা। এর মধ্যে অধিকাংশই পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে গড়ে ওঠা কারখানা, হোসিয়ারিগুলো তাদের কার্যক্রম অব্যহত  রেখেছে। আর শ্রমিকদেরও চাকরি বাঁচাতে বাধ্যতামূলক যেতে হচ্ছে।

 

 হোসিয়ারি শ্রমিক ফাতেমা আক্তার জানান, “মহাজনরা বন্ধ দেয় নাই। আমাগো ওত সমস্যা হয় না।”

 

আরেক শ্রমিক হাসান মুহাম্মদ জাহিদ জানান, “আমরা প্রডাকশনে কাজ করি। আমাদের ওত ঝামেলা নাই। কাজ থাকলে আসি আর না থাকলে চলে যাই।”

 

এদিকে নিষেধাজ্ঞার পরও হোসিয়ারিসহ অন্যান্য কারখানা খোলা রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ হোসিয়ারি এসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম সজল বলেন, “সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পোশাক কারখানাসহ হোসিয়ারিসহ সকল ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু কেউ যদি না মানে তাহলে এখানে আর কিছু বলার নেই। কারণ এ সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের সকলের সতর্কতা প্রয়োজন। নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। আমি নিজেও হোম কোয়ারেন্টাইনে আছি। আমরা এলাকাও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছেন। তাই ঘর থেকে বের হচ্ছি না।”
তিনি আরও বলেন, “যারা এখনও এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ের চিন্তা করে শ্রমিকদের ঝুঁকিতে ফেলছে তাদের ওপর প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি। প্রশাসনই এখন এ সমস্যার সমাধান করতে পারে।”

 

এ ব্যাপারে শিল্প পুলিশ-৪ এর পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন বলেন, “আমার শিল্প কারখানাসহ পাশেপাশের এলাকাগুলোতে মাইকিং করে দিচ্ছি। যাতে একবারে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বের না হয় সে ব্যাপারে পরামর্শ দিচ্ছি। আমরা অনেকটাই সফল। তবে এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা সচেতনতা প্রয়োজন।”

 

এ বিষয়ে বিকেএমই’র সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তার ফোনটি রিসিভ হয়নি।
 

এই বিভাগের আরো খবর