বুধবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ৮ ১৪৩০

সন্ত্রাস নির্ভর হত্যার রাজনীতির শিকার এক মেধাবী কিশোর

আহমদ তমিজ

প্রকাশিত: ৬ এপ্রিল ২০২২  

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর নৃশংস হত্যাকান্ডের নয় বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডটি এখন নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের মানুষের কাছে বিচারহীনতার লক্ষ বস্তুুতে পরিনত হয়েছে।

 

এ হত্যাকান্ডের সন্ত্রাস নির্ভর হত্যার রাজনীতির এক নিরঅপরাধ মেধাবী কিশোর। নারায়ণগঞ্জের মানুষ তথা ত্বকীর পরিবার এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও রাষ্ট্র প্রধানের কাছে বারবার আবেদন নিবেদন করা হলেও এক অপার রহস্যজনক কারণে এ হত্যাকান্ডের বিচার প্রক্রিয়াটি এমন থমকে দাড়িয়ে আছে।

 

দয়া মায়া ও মমত্ববোধহীন একদল পাথুরে মানুষ এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত।  ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বাড়ি থেকে বের হয়ে সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে খুনীরা ত্বকীকে অপহরণ করে। ৮ মার্চ ত্বকীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ শীতলক্ষ্যা নদীর সাথে সংযোগ কুমুদিনীর খাল থেকে উদ্ধার করা হয়, দীর্ঘ নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এ চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের চার্জশীট দাখিল করতে পারেনি র‌্যাব এর চৌকস তদন্ত কর্মকর্তারা।

 

তবে সে সময়ের র‌্যাব এর অতিরিক্ত মহা পরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকে দৃঢ়তার সাথে জানিয়ে ছিলেন র‌্যাব এর তদন্তে তথ্য প্রমাণে উঠে এসেছে এ হত্যাকাণ্ডে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা ও প্রয়াত নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমান সহ ১১জন জড়িত বলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। যে কোন দিন এ হত্যাকান্ডের চার্জশীট আদালতে দাখিল করা হবে।

 

পরবর্তীতে র‌্যাব এর তৎপরতায় এ হত্যাকান্ডের সাথে জরিত আজমেরী ওসমানের কথিত দুই সহযোগী গ্রেফতারকৃত ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কার নির্দেশে কে কোথায় কিভাবে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল তার লোমহর্ষক বর্ননা দিয়েছিল, কিন্তু এরপর র‌্যাব ঘোষিত চার্জশিট আলোর মুখ দেখেনি, এর ফলে আদালতে মামলার চলমান কার্যক্রম মূলত স্থবির হয়ে পরে। ত্বকী হত্যাকান্ডের শুরুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সামাজিক সংগঠন ত্বকী হত্যাকান্ডের পেছনে জামায়াত শিবিরের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছিল।

 

তারা সভা সমাবেশ মানববন্ধন ও বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন ত্বকী হত্যাকাণ্ডে জামায়াত শিবির জড়িত,  এ অভিযোগের ব্যাপারে আমি তৎকালীন জামায়াত নেতা মাওলানা মঈনুদ্দিনকে প্রশ্ন করে জানতে চাইলে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, আমরা ইসলামি আদর্শের রাজনীতি করি এ দৃষ্টিতে ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি আমাদের রাজনৈতিক বিরোধী হতে পারেন, কিন্তু তার মাসুম নিরপরাধ ও মেধাবী ছেলেকে হত্যা করা এটা আমাদের আর্দশ বিরোধী।

 

আমরা এহেন হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। অথচ একদল মানুষ বিচার বিবেচনা বা অনুসন্ধান না করেই রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে আমাদেরকে অন্ধভাবে এ হত্যাকান্ডপর সাথে জরিত করার অপচেষ্টা করছে। একটি নিরপরাধ মেধাবী কিশোরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আমরা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছি এতে প্রশাসন ও সরকারের প্রতি আমাদের উধার্ত্ত আহবান ছিল।

 

এ হত্যাকান্ডের সাথে যারাই জড়িত অবিলম্বে তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের সনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আল্লাহ যেন ত্বকীর মা-বাবাকে ধৈর্য ধারনের তাওফিক দান করেন। এক সময় নারায়ণগঞ্জের মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি থেকে কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা এবং পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদানকারী প্রয়াত রোকনউদ্দিন আহম্মদ এর সাথে আমার অন্য রকম একটি সম্পর্ক ছিল।

 

ষাটের দশকের শেষের দিকে শীতলক্ষ্যা এলাকায় কিশলয় লেখক গোষ্ঠী নামক একটি সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের আমি সম্পাদক থাকাকালে সে সময় কিশালয়ের সাপ্তাহিক সাহিত্য সভা গুলোতে রোকনউদ্দিন মাঝে মাঝে যোগ দিত। সভায় লেখা পাঠ না করলেও সে আলোচনায় অংশ নিয়ে চমৎকার বক্তব্য রাখতো। মাঝে মাঝে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে আমাদের মুগ্ধ করতো।

 

ফলে ওর সাথে একটা বড় ভাই ছোট ভাই সূলভ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কোন এক সন্ধায় বোস কেবিনে তাকে একান্তে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি কি মনে করো ত্বকীকে জামায়াত শিবির হত্যা করেছে সেদিন সে বলেছিল  না, ত্বকীকে জামায়াত শিবির হত্যা করেনি। জামায়াত যে আর্দশের রাজনীতি করে আমি তাদের রাজনৈতিক বিরোধী, জামায়াত রফিউর রাব্বি রাজনীতির বিরোধী হলেও এ কারণে তার ছেলেকে এভাবে হত্যা করতে পারেনা। এটা আমি বিশ্বাস করিনা বললাম।

 

তবে যে তোমরা সভা সমাবেশে ও মানববন্ধন করে বলে আসছো ত্বকী হত্যার পেছনে জামায়াত শিবিরের হাত রয়েছে। ও বললো ওটা আমাদের রাজনৈতিক বিরোধীতা। পিতা রফিউর রাব্বি দাবি করছেন এমপি শামীম ওসমানের নির্দেশে তার ভাতিজা আজমেরী ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানের ঘাতক বাহিনী ত্বকীকে অপহরণ করে আল্লামা ইকবাল রোডস্থ আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সোচ্চার নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন  ত্বকী হত্যার সাথে এই শহরের একটি প্রভাবশালী পরিবার জরিত থাকার কারনে ত্বকী হত্যার বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।

 

 ত্বকী হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীতে অটল সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সাহসী নেতা কর্মীদের অবশ্যই প্রশংসা করতে হয়। শত হুমকি হামলার শিকার হয়েও তারা গত নয় বছর ধরে এ হত্যার বিচারের দাবীতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আর্সছেন। দেশের বরণ্য সাংবাদিক রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব শিক্ষক সাংস্কৃতিক সংগঠন, আইনজীবী ও বুদ্ধিজীবিরাও বিভিন্ন সময় এ হত্যাকান্ডের জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের দাবী জানিয়েছেন। এদেও মধ্যে এমন সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরাও ছিলেন, যাদেও সাথে আওয়ামীলীগ প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ব্যক্তিগত সুসর্ম্পক রয়েছে।

 

কিন্তু প্রশাসন আইন আদালত এমনকি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কোন প্রতিক্রিয়া অধ্যাবধি লক্ষ করা যাচ্ছে না। এখানে স্মরণযোগ চাঞ্চল্যকর সেভেন মার্ডারের বিচারটি সর্বোচ্চ মহলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকায় সহসেই সম্পন্ন হতে পেরেছিল। তেমনিভাবে ত্বকী হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারনেই তা সম্পন্ন হতে পারছেনা।

 

আমি ব্যাক্তিগত ভাবে দলীয় রাজনীতিতে একজন অবিশ্বাসী মাসুম। মনে পড়ে ভারতের বিখ্যাত সাহিত্য সেবি অধ্যাপক হুমায়ুন কবির রাজনীতিতে প্রবেশ করলে তখন তার এক শুভানুধ্যায়ী মন্তব্য করেছিলেন হুমায়ুন কবির সাহিত্যের নান্দনিক জগৎ ছেড়ে রাজনীতির নিষ্ঠুর জগতে প্রবেশ করলেন। পারমাণবিক বোমার জনক হিসাবে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন ইতিহাস প্রমাণ করে যুগে যুগে পৃথিবীতে যত অকল্যাণ ও অমঙল দেখা দিয়েছে তার প্রত্যকটির জন্য দায়ী হলো রাজনীতিবিদরা।

 

অনেকে বলে থাকেন বর্তমান সরকারের আমলেই ত্বকী হত্যার বিচার সম্পন্ন হবে।  তাদের স্মরনার্থে বলছি ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল এমপি নাসিম ওসমান বিদেশে মৃত্যুবরন করলে ৩ জুন জাতীয় সংসদে অধিবেশনে শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনা কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি সব সময় সব সংকটে ওসমান পরিবারের পাশে থাকবেন।

 

এখন পর্যন্ত তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলছেন। আমারও দৃড়বিশ্বাস ত্বকী হত্যার বিচার একদিন হবে, তবে বর্তমান সরকারের শাসন আমলে নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন যে ফুল না ফুটিতে ঝরিল ধরনীতে/ যে নদী মরুপথে হারালো ধারা/ জানিহে জানি তাহাও হয়নি হারা/ বীরের এই রক্তস্রোত মায়ের ঐ অশ্রুধারা, ধরায় ধূলায় হবেকি হারা?  জানিহে জানি তাহাও হয়নি হারা।  লেখক : আইনজীবী ও সাংবাদিক।
 

এই বিভাগের আরো খবর