শনিবার   ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৩০ ১৪২৬   ১৬ রবিউস সানি ১৪৪১

লিউকোরিয়া (Leucorrhoea) চিকিৎসা ও প্রতিকারে হোমিওপ্যাথি 

প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর ২০১৯  

মেয়েদের জননেন্দ্রিয়ে স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য যোনিপথে একপ্রকার তরলজাতীয় পদার্থ নির্গত হয়। আর এই তরলজাতীয় পদার্থ যখন কোনো কারণে মাত্রাতিরিক্ত নির্গত হয়, তখন তাকে লিউকোরিয়া বা সাদাস্রাব বলে।একে শ্বেতপ্রদরও বলা হয়। 


মেয়েদের অতি প্রয়োজনীয় একটি হরমোন হলো এস্ট্রোজেন। আর এ এস্ট্রোজেনকে বলা হয় মেয়েলি হরমোন (Female Hormone)। অতি প্রয়োজনীয় এই হরমোনই একজন মেয়ের সমস্ত মেয়েলি স্বভাব এবং সৌন্দর্যের কারণ ও উৎস। জীবনের কিছু কিছু সময় এই হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়, যেমন-একটি মেয়েশিশু যখন পরিপূর্ণ যুবতী হয়ে ওঠে বা গর্ভধারণের সময় এবং বিবাহের পরে জন্মবিরতিকরণ পিল সেবনকালীন দেহে প্রচুর হরমোন বেড়ে যায়। কারণ এই পিলে থাকে প্রয়োজনীয় এস্ট্রোজেন হরমোন।

 

জন্মের পরপর কন্যাশিশুদের লিউকোরিয়া হতে পারে। এটা হয় মায়ের শরীর থেকে পাওয়া এস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে। নবজাতক কন্যাশিশুদের জন্মের পর থেকে ১০দিনের মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই সাদাস্রাব হতে পারে। স্কুলে পড়ুয়া শিশুদেরও এই স্রাব হতে পারে,তা আবার ৩-৪ দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়। যদি ঠিক না হয় তাহলে চিকিৎসা নিতে হবে।


জেনে রাখুন, মেয়েদের যে কোনো বয়সের যে কোনো সময় কম-বেশি সাদাস্রাব হতে পারে। এটি নারীদের পরিচিত ও সাধারণ একটি সমস্যা। হোমিওপ্যাথি দর্শন অনুযায়ী, এটির সুচিকিৎসা হতে হয়। কারণ এটি কখনো মারাত্মক আকার ধারণ করে অনেক পীড়া এমন কি জরায়ুমুখে প্রথমে ঘা পরে ক্যান্সারের মতো রোগ সৃষ্টি করেতে পারে।


কারণ : শ্বেতপ্রদর বা সাদাস্রাবের কমন একটি কারণ হচ্ছে ফাঙ্গাল ইনফেকশন। ফাঙ্গাল ইনফেকশন হলে স্রাব দুধের ছানার মত সাদা চাপ চাপ আকারে বের হয় এবং যোনিতে প্রচণ্ড চুলকানি হয়।শরীরিক বিভিন্ন পরিবর্তন, হস্তমৈথুন বা মাস্টারবেশন, প্রাপ্ত বয়সে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণের সময়, হস্তমৈুন বা মাস্টারবেশন (অভুলেশন), গর্ভাবস্থায়,অনিয়মিত মাসিক, মাসিক একবারে বন্ধ, মাসিকের সময় ঋতুস্রাব কমে গেলে, বিবাহিতদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত সহবাস,অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দুর্বল স্বাস্থ্য, অপুষ্টি, ভিটামিন, প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের অভাব, রক্তশূন্যতা, কিডনির রোগ, যক্ষ্মা, ক্লোরোসিস, হৃদপিণ্ড বা ফুসফুসের কোনো পীড়ায় রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত, পুরাতন কোষ্ঠকাঠিন্য, জরায়ুতে পেশারি প্রয়োগ ও এর স্থানচ্যুতি, বিষণ্নতা, জন্মবিরতিকরণ পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, গরম আবহাওয়ায় অনেক সময় অধিকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করা, শিশুদের কৃমিজনিত সমস্যা, ইত্যাদি কারণেও লিউকোরিয়া হতে পারে। 

 

এছাড়াও Trichomonas,candida albicans,Chlamydia trachomatis,Neisseria gonorrhoeae প্রভৃতি জীবাণুঘটিত কারণে এটি হতে পারে। আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের সাদাস্রাব বেশীরভাগই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। Candida albicans দ্বারা ক্যান্ডিডিয়েসিস, Trichomonas দ্বারা ট্রাইকোমোনিয়েসিস, Neisseria gonorrhoeae দ্বারা গনোরিয়া এবং Chlamydia trachomatis দ্বারা ক্লামাইডিয়াল ইনফেকশন নামক এই ৪টি সংক্রামক যৌনরোগ, বয়স্ক নারীদের সাদাস্রাব হওয়ার অন্যতম কারণ।ডায়াবেটিস, দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন এটির প্রকোপ বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

লক্ষণ : পীড়া আরম্ভর পূর্বে কারো কারো প্রথমে কোমড়ে ও কুচকির স্থানে টেনে ধরার মত এক প্রকার ব্যথা, তলপেট ভারী ও প্রস্রাব অল্প পরিমাণে হতে পারে। প্রস্রাবে কোথানী থাকে, তলপেটে চাপ দিলে ব্যথা লাগে, সামান্য জ্বর জ্বর ভাবও থাকতে পারে।এই অবস্থাা প্রকাশ হওয়ার ৩-৪ দিন পরে জরায়ু থেকে স্রাব নির্গত হয়। স্রাব প্রথমে তরল,স্বচ্ছ ও আঠারমত চটচটে থাকে (দেখতে ঠিক ডিমের লালা বা শ্বেতাংশের মত),পরে ক্রমশঃ ঘন ও পুযেঁরমত হয়। 


প্রথম দিন থেকে ৬-৭ দিনের মধ্যে জ্বর-জ্বর ভাবসহ স্রাবের পরিমাণ কমে গিয়ে সমস্যাটি প্রাকৃতিকভাবেই সেরে যায়।আবার কারো কারো ক্ষেত্রে পীড়াটি দীর্ঘদিন চলতে থাকে।এটি সবুজ, রক্ত মিশ্রিত, চাল ধোয়া পানির মত-হলদে, হলদে-সবুজ মিশ্রিত,পনিরেরমত, দুধের মত সাদা, ভাতের মারের মত সাদা, কখনো তরল (তরুণ সর্দির মত), কখনো গাঢ় ইত্যাদি প্রকারের স্রাব নির্গত হতে পারে। আবার কিছু স্রাবের কারণে যোনিদ্বার চুলকায়, ঘা হয় ও জ্বালা করে। এই স্রাব মাসিক হওয়ার পূর্বে ও পরে বা যে কোনও সময় হতে পারে। 

 

যৌনসংক্রামক রোগ বা জীবাণু সংক্রমণের দ্বারা সাদাস্রাব হলে তার প্রাথমিক প্রধাণ লক্ষণ হচ্ছে, অতিরিক্ত পরিমাণে সাদাস্রাব হওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া এবং যৌনাঙ্গে চুলকানি বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেওয়া। যেমন-ট্রাইকোমানাস ভ্যাজাইনালিস নামক জীবাণুর কারণে হলে স্রাবের পরিমাণ বেশি হয়। স্রাব কখনো সাদা দইয়ের মতো বা ভাতের মারের মত, কখনো কিছুটা ঘন সবুজাভ বা হলদে কালার হয়। ক্যানডিডা এলবিকানস জীবাণুর কারণে হলে জননাঙ্গে চুলকানি হয়। গনোরিয়ার জীবাণু দ্বারা হলে স্রাবে দুর্গন্ধ হয়। সব ক্ষেত্রেই তলপেটে, কোমরে বা পিঠে ব্যথা হতে পারে। শরীর দুর্বল, মাথা ঘোরা, খাবারে অরুচি ইত্যাদি উপসর্গও থাকতে পারে। ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ ও প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হতে পারে।

 

চিকিৎসা : হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় রোগের নামের ওপর কোনো ওষুধ প্রয়োগ করা যায়না। কেউ করলেও তাতে ভাল ফল পাওয়া যায়না।কারণ এই চিকিৎসায় রোগ ও রোগীর লক্ষণ সমষ্টির মাধ্যমে ওষুধ নির্বাচন করে চিকিৎসা দিতে হয়।তাই যে কারণেই লিউকোরিয়া হোকনা কেন,তা সঠিক ওষুধ নির্বাচনেনর মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে পারলে অতি দ্রুত ও স্বল্প সময়ে লিউকোরিয়া আরোগ্য করা সম্ভব। 


হোমিওপ্যাথি দর্শন মতে, সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস এই তিন বিষের প্রভাবে মানব দেহে সমস্ত প্রকারের রোগ আসে। আর সাইকোসিস বিষ হলো উক্ত তিন প্রকারের মধ্যে একটি।এ জন্যই কোনো কোনো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের মতে, এটি একটি সাইকোটিক পীড়া। কারণ সাইকোসিস দোষ থেকে উৎপন্ন হতে পারে এটি। তাই এদিকে লক্ষ্য রেখে প্রয়োজনীয় সাইকোসিস দোষের প্রতিকার ও প্রতিষেধক ওষুধ দিয়ে রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে হয়। 


প্রাথমিকভাবে Sepia, Kreosote, Alumina, Borax, pulsatilla, platina, Ammon Carb,Ammon Mur, Bovista,Cal Carb, Cal phos, Caulophylum, Fer Met, Hydrastis Can, Secale Cor, Thuja Occ, প্রভৃতি ওষুধ লক্ষণানুসারে যেকোন ১টি বা ২টি ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে পারেন। কিন্তু রোগের তীব্রতা, হ্রাস-বৃদ্ধি, রোগের কারণ ও উৎস অনুসন্ধান, রোগীর আহার নিদ্রা, অরুচি, ঠাণ্ডা-গরমে ও নড়াচড়ায় রোগের হ্রাস বা বৃদ্ধি, ধাতুগত ও মানসিক লক্ষণ ইত্যাদি উপসর্গ অনুসারে উক্ত ওষুধের ডোজ, মাত্রা, শক্তি, একজন চিকিৎসকই নির্ধারণ করতে পারেন। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা দরকার।


পরীক্ষা : হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় তেমন কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না।কারণ রোগী ও রোগের লক্ষণ সমষ্টির চিকিৎসা পদ্ধতি এটি। তারপরেও রোগীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে ক্যান্সারের মত কোনো রোগ সন্দেহ হলে কিছু পরীক্ষা প্রত্যেক নারীরই করা প্রয়োজন; VIA Testএটি একটি প্রাথমিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় জরায়ুর মুখে একটি দ্রবণ দিয়ে (৫ শতাংশ  Acetic Acid খালি চোখে পরীক্ষা করা হয় (তবে এই পরীক্ষা বিশেষজ্ঞ ব্যতীত নিজে করবেন না)। যদি উক্ত পরীক্ষায় সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক কিছু দেখা যায় তাহলে Colposcopy এবং প্রয়োজনে Biopsy করে প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার বা ক্যান্সার পূর্ববর্তী রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।


পরামর্শ : কারো কারো বয়ঃসন্ধিকালে মাসিক শুরু হওয়ার আগে এবং মাসিক শেষ হওয়ার পরে কয়েকদিন কোনো কারণ ছাড়াই সামান্য সাদাস্রাব নির্গত হতে পারে। এটি অস্বাভাবিক তেমন কিছু না। এ ধরণের সাদাস্রাব সাধারণত প্রতিমাসে হবে না।এটি যদি প্রতি মাসে ও দীর্ঘদিন চলতে থাকে এবং কোনো সমস্যা তৈরি করে, তাহলে চিকিৎসা নিতে হবে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও টেনশন, ব্যক্তিগত অপরিচ্ছন্নতা ও অপুষ্টি এ সমস্যাটিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও টেনশন একেবারে দূর না করা গেলেও সহনীয় পর্যায় নিয়ে আসেতে হবে।  

 

সর্বদা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। নিয়মিত ধোয়া ও পরিষ্কার অন্তর্বাস পরতে হবে। ১০০%সুতি কাপরের অন্তর্বাস ব্যবহার করতে হবে। ঠিকমত পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খাবেন। পর্যাপ্ত বিশদ্ধ খাবার পানি পান করবেন। রসালো ফল, শাকসবজি ও দেশি ফল বেশি বেশি খাবেন।সুগন্ধি ও বডি স্প্রে ব্যবহার না করাই ভালো।কুসুম গরম পানি ও কম ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহার করা উচিৎ।

 

আরেকটি কথা না-বললেই নয়-অনেক রোগী এসে বলেন, আমি অনেক এলোপ্যাথি চিকিৎসা করিয়েছি, অনেক ওষুধ খেয়েছি, ব্যবহার করেছি, টেস্ট করিয়েছি কিন্তু কোনো রোগ ধরা পরেনি। তবুও এই চিকিৎসায় কোনো উপকার পাই নাই। আসলে এলোপ্যাথি চিকিৎসায়, জীবাণুঘটিত কারণে লিউকোরিয়া হলে রোগী টিনিডাজোল, মেট্রোনিডাজোল গ্রুপের ওষুধ খেতে দেয় এবং অনেক সময় অ্যান্টিফাংগাল ক্রিম, ভ্যাজাইনাল ট্যাবলেট ব্যবহার করতে দেয়। 

 

ক্ষেত্রবিশেষে অ্যান্টিবায়োটিকও খেতে দেয়। কিন্তু  বাস্তবে দেখাগেছে যে, (রোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী) অনেক রোগীই এই চিকিৎসায় কোনো উপকারই পান নাই। প্রকৃতপক্ষে এ ধরণের রোগীদের জন্য হোমিও চিকিৎসাই অধিকতর ভালো।যে কারণেই লিউকোরিয়া হউকনা কেনো তা হোমিও চিকিৎসায় সম্পূর্ণ আরোগ্য সম্ভব। সাইড এফেক্ট মুক্ত হোমিও চিকিৎসা নিন, সুস্থ থাকুন।

 

ডা.গাজী মো.খায়রুজ্জামান
লেখক : হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট 
মোবাইল : ০১৭৪৩ ৮৩ ৪৮ ১৬
ই-মেইল : kh.zaman31@gmail.com

এই বিভাগের আরো খবর